শারদীয়া সংখ্যা ১৪৩২ | প্রকাশ: 27 September 2025 সম্পাদক: মলয় মজুমদার
প্রবন্ধ

নির্জনের কবি -- পিনাকী ঠাকুর

-- সৌম্য ঘোষ

নির্জনের কবি -- পিনাকী ঠাকুর
27 Sep 2025
241 Views
0 0
Share:
Responsive Ad Unit (e.g., 728x90 or 320x100)

দৈনন্দিন জীবন থেকেই মানুষ জীবনের মৌল পাঠ গ্রহণ করেন। আর কবিরা প্রাত্যহিক জীবনের আনন্দ-বেদনা, অপমান-লাঞ্ছনা কিংবা সমাজ-রাষ্ট্রের নানান অসঙ্গতি এবং অবারিত প্রকৃতিসহ দৈনন্দিনতা খুঁড়ে শব্দ আহরণ করে তা ঘষে-মেজে তৈরি করেন কবিতার কাঠামো। এরপর ছন্দ, কাব্যিক উপমা ও উৎপ্রেক্ষার শাব্দিক অলঙ্কারে বিনির্মাণ করেন কবিতাকে; যাতে কথা, বিচার ও তাৎপর্যের সমন্বয় থাকে, প্রতিভাত হয় বিশ্বচরাচরে সর্বশেষ আলোচিত ঘটনা। সাধারণ মানুষ অভিধানের শব্দাবলী জীবনের প্রয়োজনে ব্যবহার করেন ঠিকই, কিন্তু কবির ব্যবহৃত শব্দাবলী আভিধানিক অর্থ ছাড়িয়ে যায়, আর এখানেই কবির সার্থকতা। কবিতাবোদ্ধাদের মতে, কবিতায় ব্যবহৃত প্রত্যেকটি শব্দই একেকটি চিত্রকর্ম। উপমা, উৎপ্রেক্ষা, ভাবনা বা কবির বোধ, মনন ও চৈতন্যে মুগ্ধতার আবেশ, কবির বিমূর্ত ভাবনায় কবিতা হয়ে ওঠে পরিপূর্ণ ও জীবন্ত। 

              কবিদের জীবনযাপনই কবিতা --- এ কথা যদি সত্যি হয় তাহলে কবি পিনাকী ঠাকুরের কবিতা যেন জীবনের ছবি। কবি পিনাকী ঠাকুরের কবিতা  প্রথম পড়ি দেশ পত্রিকায়। সেসময় আমি দমদমে থাকতাম। যদিও কবিতার নাম ঠিক মনে নেই তবুও সেদিন আমার অনুভব আজও  জাগ্রত করে। সাধারণত কোন কবির কবিতা পড়ার সময় আমি নিজে কবিতা লেখার কথা ভাবি না। তার প্রধান কারণ, কিছু কবির কবিতা এতটাই শক্তিশালী যে, আপনার লেখাকে প্রভাবিত করবেই। কবি পিনাকী ঠাকুর ঠিক তেমনি এক শক্তিশালী কবি। তার কাব্যগ্রন্থগুলি পড়ে, অনুভব হয়, সাধারণ থেকেও যে অসাধারণ হওয়া যায়, খুব সামান্য বিষয়ে দিয়ে যে বিশ্বের তাগোর ভাবনা ও দর্শনকে প্রকাশ করা যায়, সেটা পিনাকী দেখিয়েছেন। গতানুগতিক লেখার বাইরে এসেও কবির শব্দচয়ন থেকে শুরু করে ভাব-ভাষা- -প্রকাশ ইত্যাদির বিস্তার মুগ্ধ করবেই। তার কবিতার বিরাট অংশ জুড়ে পাওয়া যায় মফ:স্বলের জীবনযাত্রা, চলন-বলন, চিত্রতা ও সাধারণ মানুষের রোজনামচা। 

In-article Ad Unit

                    নিকানোর পাররা বলেছেন, ‘কবিতা আমাদের কাছে এতোটাই জরুরি যে, আমরা কবিতা ছাড়া বাঁচতেই পারি না।’প্রকৃতপক্ষে কবিতা বাঁচার স্বপ্ন দেখায়, বুক টান করে দাঁড়াবার সাহস যোগায়। কবিতা শুধু বুদ্ধিচর্চা নয়, একজন কবি 'কবিতা দ্বারা তাড়িত'। এ জন্য বলা হয়, কবিতা শুধু intellect exercise নয়, কবিতা জীবনের বাস্তবতাও। কবিতা দর্শন নয়, কিন্তু philosophy of all writing। দুঃখ-যন্ত্রণা, জরা-খরা ও হতাশা আক্রান্ত মৃত্যুপথযাত্রীর চোখে কবিতা বাঁচার স্বপ্ন দেখায়। সকল স্বৈরাচার, সকল অসত্যের বিরুদ্ধে কবিতা শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার। একজন কবি কিম্বা কবিতাপ্রেমীর কাছে কবিতার চেয়ে প্রিয় কিছু নেই। এ জন্যই দেখা যায় কবিতার প্রেমে কবি ঘর ছাড়া হয়ে যান। কবিতার জন্য তিনি ত্যাগ করেন সকল সুযোগ, আরাম-আয়েশ।

               এই সত্যের প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত স্বয়ং পিনাকী।

উজ্জ্বল কেরিয়ার হেলায় ত্যাগ করলেন শুধু কবিতা নিয়ে থাকবেন বলে। 

"তোমার লেখা পড়তে গিয়ে বুঝেছি এইটুকু

গোটা একটা দশক ধরে লিখেছি ছাইপাঁশ

অর্থবিহীন সুরকি বালি কথার পরে কথা

দুয়োর জুড়ে হেলায় বাড়ে নরম মুথোঘাস

শব্দ তোমার সিকনি ঝরা ন্যাংটাপুটো ছেলে

দুই বিনুনি কিশোরী গ্রাম শান্ত, অবনতা।

তোমার লেখা পড়ব বলে একলা ভিড়ে হাঁটি

শহরতলির চাঁদ নেমেছে ভাতের থালা জুড়ে

ঠিকে শ্রমিক, লক্ষ্মীভাঁড়ে আধুলি আর সিকি

মায়ায় মোড়া জীবন ঘুমোয় একফালি চৌপায়া

ঋণ ছিল না চিনিপুকুর গ্রামের পথে পথে

আবার যেন সব কবিতা প্রথম থেকে লিখি….."

                            প্রায় আত্মকথনের মতো করেই ‘চিরবসন্তের খসড়া’ লেখাটিতে প্রথম-নব্বইয়ের কবি পিনাকী ঠাকুর যে কাঁচা লেখার কথা বলেছেন, তাকে তাঁর অনুর্ধ্ব চল্লিশ সময়কালের লেখা বলে ধরে নেওয়া যায়। এই পর্যায়ে তাঁর তিনটি পূর্ণাঙ্গ কাব্যগ্রন্থ--- ‘একদিন, অশরীরী’, ‘আমরা রইলাম’, ‘অঙ্কে যত শূন্য পেলে’। পিনাকী ঠিক কবে থেকে কবিতাযাপন শুরু করেছেন? বোধ হয় সাতের দশকের শেষদিক। কেননা এ সময় একটি সংকলনে আরও পাঁচজন কবির সঙ্গে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়। এ যাপনচরিতের সূচনা নির্ধারণ কেবল কবিতা ‘লেখার’ নিরিখেই। কেননা কবিতা পড়া আর শোনার অভ্যাস তার বহু আগে থেকে, বাল্যকালে যেভাবে কবিতাবীজ বোনা হয় বেশিরভাগ কবির মগজের ভেতর, পিনাকীর ক্ষেত্রেও ঘটেছিল তেমনটাই। পরিবার, মূলত একনিষ্ঠ বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মী পিতা অমল ঠাকুর, কাব্যচেতনায় তাঁর প্রথম বটচ্ছায়া। পিনাকী তাঁর প্রথম প্রকাশিত বই ‘একদিন, অশরীরী’-র দীর্ঘ গুচ্ছকবিতায় লিখছেন : “বাবার ভরাট কণ্ঠে ঈশানের পুঞ্জমেঘ, না-বুঝেও শেষের কবিতা!”

          লিটিল ম্যাগাজিনের জন্য তাঁর ভালবাসা ছিল হিমোগ্লোবিনের মতো রক্তের সঙ্গে মিশে। ‘দেশ’ পত্রিকা ছাড়াও ধারাবাহিক ভাবে নিয়মিত কবিতা লিখেছেন, তাঁতঘর, দাহপত্র, রক্তমাংস, বিজল্প, কবিকৃতি, বারোমাস ইত্যাদি অজস্র পত্রিকায়। ছোটদের জন্য গল্প লিখেছেন রবিবাসরীয় আনন্দমেলায়, কবিতা সন্দেশ পত্রিকায়। কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানে কখনো তাঁকে দেখা গেছে বাংলা আকাদেমি, শিশির মঞ্চ, জীবনানন্দ সভাঘরে কখনও বা বাংলার আনাচে কানাচে প্রত্যন্ত অঞ্চলে। বলতেন, প্রতিটি স্টেশনেই আমার একটা করে বন্ধু আছে।

               'একদিন, অশরীরী’ বইয়ের প্রথম প্রকাশ ১৯৯৪-এর বইমেলায়। অর্থাৎ জানুয়ারি মাস। কবির বয়স তখন প্রায়-পঁয়ত্রিশ। প্রকাশক স্বর্ণাক্ষর। এ বইয়ের অন্তর্ভুক্ত বসন্তের টুকরো কবিতায় তিনি লিখছেন : “হেমন্ত মণ্ডল যত খিস্তি দিক, মাইনে কেটে দিক/ পুকুরে চাঁদের থালা ভেঙে তোকে আবার হাসাব”। কবিতায় কথক এক যুবক যে হেমন্ত মণ্ডল নামে জনৈক ব্যক্তির দোকানে কাজ করে। এ লেখার শুরুর অংশ : 

'এইসব কাঁচা সময়ের, কাঁচা আবেগের চিত্রকল্প— কৈশোর, যৌবন জুড়ে মফ:স্বলের এক লাজুক কবিকে যা ঘিরে থাকে, আগলে রাখে।'

                   অনুভূতির সর্বস্তরে, সব মেজাজে  নিপুণ ও নিখুঁত পিনাকীর  কবিকৃতি। তিনি যে শরীরে-মনে এই-সময়ের-কবি। এই একুশ শতকের। তাই শব্দপ্রয়োগেও যথারীতি ছুৎমার্গ নেই । রকের ভাষা-মুখেরভাষাকে অবলীলায় এক ক’রে কবিতায় গেঁথে দেন। চলতি ইংরেজি-হিন্দি শব্দের যথাযথ, ঝকঝকে ব্যবহার। শব্দের খেলায় যে তিনি একজন সার্থক ‘জাগলার’ এব্যাপারে সন্দেহ নেই। দক্ষ-হাতের শব্দচয়ন এবং পংক্তিতে তার অনায়াস চলাচলে যে কত কত স্মরণযোগ্য কবিতা জন্ম নিয়েছে পাঠকমাত্রেই তা মনে করতে পারবেন। নব্বইইয়ের গোড়ায় আলোড়ন ফেলে অনেকেই এক অন্য-ভূখন্ডের সন্ধানকামী হয়েছিলেন; একথা বলতে দ্বিধা নেই, পিনাকীই সর্বপ্রথম  ‘স্মার্টনেস’ আনেন নিজের লেখায়। 

                চার বছর অতিবাহিত করে পিনাকী লিখলেন তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ— ‘আমরা রইলাম’। প্রকাশ করল বিজল্প, ১৯৯৮-এর বইমেলায়। চার বছরের ব্যবধানে স্বভাবতই কবি নিজের রিকনস্ট্রাকশন করেছেন কিছুটা। লেখাগুলোর শিরোনাম তাই বইয়ের নামের মতোই অনেক বেশি সোজাসাপটা। এক্সপ্লিসিট নয়, কিন্তু স্ট্রেট।

         তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘অঙ্কে যত শূন্য পেলে’-র প্রথম লেখা ‘এক জীবনে’। তার শেষ লাইনগুলো এমনই স্মৃতিমেদুর। যতবারই পাঠ করা হোক, মনে হয়, বসন্তের হা-হুতাশ দুপুরকে যেন  দুমড়ে মুচড়ে দিয়ে যাচ্ছে আদ্যোপান্ত। দ্বিতীয় বইয়ের ঠিক এক বছর পরেই এই বইটি, সাল ১৯৯৯।

              প্রতিটি ভাবনার বৈচিত্র্যের উৎসে থাকে একটি সত্তা — যে সত্তা ব্রহ্মস্বরূপ। ঐতরেয় উপনিষদে বলা হয়েছেঃ “সর্বাণ্যেবৈতানি প্রজ্ঞানস্য নামধেয়ানি ভবন্তি ।” (৩/১/২) । অর্থাৎ সমস্তই প্রজ্ঞারূপ আত্মার উপলব্ধির দ্বার। সুতরাং সমস্ত সৃষ্টির উৎসই  প্রজ্ঞা। এই প্রজ্ঞাতেই কবিকে ফিরে যেতে হয়। সৃষ্টি তো সমুদ্রের মতো ঢেউ ও অন্ধকারে জটিল, অস্থির। সেখানেই হাতড়াতে হয় আদিম সত্তাকে। যে সত্তা কবির একার নয়, ভূমার। অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো ব্রহ্মসত্তা থেকে ছড়িয়ে পড়ে জগতময়। আবার সেখানেই ফিরে যেতে হয়। 

                  পিনাকীর সমস্ত বই যদি কালানুক্রমে সাজিয়ে পড়া যায়, তবে শুধুমাত্র তাঁর কবিতায় রাজনৈতিক চেতনা নিয়েই একটি পৃথক গ্রন্থ প্রকাশ হতে পারে।  সাদা-কালো, ডান-বাম, সমাজতন্ত্র-ধনতন্ত্র, পিতৃতন্ত্র-নারীবাদের পরস্পর বিপরীতমুখী রাজনীতি নয়। প্রতিটা কাব্যগ্রন্থের একাধিক লেখায়, প্রতিটি লেখার নানান পংক্তিতে তিনি স্বাক্ষর রেখে গিয়েছেন তাঁর ব্যক্তিগত বিশ্বাস, সমাজচেতনা, আত্মবীক্ষণ। নানান দৃষ্টিকোণ থেকে জীবনের অনুসন্ধান তাই সার্থকভাবেই এক ও একাধিক রাজনৈতিক বোধের জন্ম দেয়। আর সেটাই পিনাকীর সিগনেচার।

                      তাঁর ‘মৌসম’ গ্রন্থের কবিতাগুচ্ছ মোটামুটি তিনটি পর্বে বিভাজিত। এর মধ্যে শেষ পর্বের (বাংলার ব-দ্বীপ) কবিতাগুলি আঙ্গিকে-আবেদনে বাকিদের তুলনায় একেবারেই ভিন্ন-ধর্মীয়; 'মৌসম’-এর প্রথম দুটি পর্বের প্রায় সমস্ত লেখাতেই বাঙ্ময় হয়ে রয়েছে ‘প্রেম’। সেই প্রেম-যা একেবারেই পিনাকীর নিজস্ব ঘরানার; স্বকীয় এক-অনবদ্য স্টাইলের শিল্পিত লিপিরূপ।

পিনাকীর ‘সিগনেচার স্টাইলাইজেশন’ এমনই। অদ্বিতীয় এবং অনন্য। একটি লেখার ছিন্ন অংশ তুলে দিচ্ছি-----

“শিউরে ওঠে লোহার মতন সর্পফণা

জাগছে, ওহো, জেগে ওঠার কী যন্ত্রণা

এবার কিন্তু উগরে দেবে বিষের ঝলক…

আঃ পারছিনা, দু ঠোঁট দিয়ে বিষ তুলে নাও,

আদর করো!”

(বেদেনি)

            প্যাশনের এই উদ্দাম তীব্রতাই পিনাকীর প্রেম-আকুল-করা, লন্ডভন্ড, ছিঁড়ে-খুঁড়ে দেওয়া পাগলামি; উথালপাথাল আবেগ- ভয় পায় না ধ্বংসকেও। জ্বলে এবং জ্বালায়। পুড়তে পুড়তে নির্মাণ করে প্রতিটি অক্ষর। পিনাকী ঠাকুরের প্যাশন আদ্যোপান্ত রক্তমাংসময়। টি. এস. এলিয়ট Four Quartets কাব্যের Burnt Norton কবিতাংশে বলেছেন :

“Time present and time past. 

Are both perhaps present in time future.

 And time future contained in time past.”

রবীন্দ্রনাথ “কথা কও, কথা কও” বলে  স্তব্ধতা ভাঙতে চেয়েছেন। সময়ের ধারায় এ ভাবেই চিরকবিতায় কবিদের জাগায়। সেভাবেই চিরকাল

পিনাকী জেগে থাকবেন কাব্যপ্রেমীদের হৃদয়ে।।

Responsive Ad Unit (e.g., 728x90 or 320x100)

0 মন্তব্য

আপনার মন্তব্য জানান

সর্বাধিক পছন্দের লেখা

সর্বাধিক পঠিত লেখা