প্রতি বছর ধান ওঠার আগের এক দু মাস আমাদের সংসারে বেশ টান পড়ত। বাড়িতে ধান চাল না থাকলে খিদে ও বেড়ে যেত তিন গুন। সারাক্ষণ পেট যেন খাই খাই করত। আর উসখুস করত মনটা। মা, ঠাকুমারদের কঠিন পরীক্ষার দিন শুরু হয়ে যেত।
সম্ভবত আমি তখন ক্লাস টু তে পড়তাম। জলের অভাবে সেই বছর আউস ধানের চাষ একদম ভালো হল না। সংসারে নেমে এল এক বিষাদের ছায়া। সর্ব সাকুল্যে মাত্র কয়েক মন ধান। বেশির ভাগই অপুষ্ট -আঁকড়া। তার মধ্যে কিছুটা অংশ বিক্রি করতে হবে। নইলে জামা-কাপড়, ঔষধ পত্র আসবে কোত্থেকে! অন্যদিকে আমাদের যৌথ পরিবারে সবাই মিলে আমরা দশ জন । দশটা ক্ষুধার্ত পেটের খাবার দাবার কোত্থেকে আসবে এই নিয়েই বাবা ও কাকা ভীষণভাবে চিন্তিত। পরের মরসুমের আমন ধান উঠবে সেই অগ্রহায়ণ মাসে। এখনো প্রায় ছয় মাস। তবে তারও তেমন কোন নিশ্চয়তা নেই। পরিমাণ মতো বৃষ্টি বাদল হলে, আর চাষবাদ ভালো হলেই মঙ্গল । তবু তো আজীবন আশায় বেঁচে থাকে চাষা।
আমাদের বাড়ি সংলগ্ন উঁচু জমির পরিমাণ খুব একটা বেশি না হলে নেহাত কম নয়। প্রতি বছরের মতো কয়েক কাঠা জমিতে লাগানো হল ঢেড়স, ঝিঙ্গে, লাউ, কুমড়ো, নানান শাক সবজি। বর্ষাও নেমে এল তাড়াতাড়ি। ফলন বেশ ভালো হতে শুরু করলো।
যেহেতু এ বছরের অধিকাংশ ধান অপুষ্ট, ধান ভানলে যে চাল পাওয়া যেত তা বেশির ভাগ অংশ ভাঙা কিংবা কালচে। আমাদের নিয়মিত প্রাতঃরাশের অভ্যাসটা পালটে গেল রাতারাতি। ভাঙা চাল বা খুদসেদ্ধ নুন তেল দিয়ে গোগ্রাসে গিলে নিত সবাই। এক আধ বার কাঁচা পেঁয়াজ আর আলু সেদ্ধ পেলে ব্যাপারটা বেশ জমে যেত। মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন তেমন কিছু না থাকলে বাড়ির পুকুরের মাছ প্রায় থাকত। তার সঙ্গে পুইশাক, লাউ ডাঁটা, বা তেলাকুচি পাতার চচ্চড়ি। কিছু দিনের মধ্যেই বাড়ির সবজি ফলতে শুরু হতেই কিছুটা ভালো হতে শুরু হল।
আর হ্যাঁ, একটা কথা বলা হয়নি।এই এলাকার বেশির ভাগ মানুষের দৈনন্দিন জীবন যাপন মাদুর শিল্পের সঙ্গে ওতোপ্রত ভাবে জড়িত। যেটুকু চালের প্রয়োজন চাষের ধান থেকেই চাল এসে যেত। আর মাঁদুর বুনেই সংসার বাকী সমস্ত খরচের সিংহ ভাগ এসে যেত। আমাদের বাড়িতেও মাদুর বুনা হত। তবে দশ জনের সংসার চালানোর জন্য মোটেই যথেষ্ট নয়।
এ বছর আমন ধানের ফলন বেশ ভাল হতে পারে। গোলধরছে বেশ ভালো। বাবা, কাকা আর পাড়ার জ্যেঠু আলোচনা করত এবার নল সংক্রান্তি বেশ জমিয়ে করতেই হবে। তবেই নাকি ভালো থোর বেরোবে আর ধানের শিষ ও বেশ লম্বা লম্বা হবে।
কিন্তু বিধাতার কোন খেয়ালে অতি বৃষ্টি শুরু হলো। কয়েক দিনের মধ্যেই কেলেঘাই কপালেশ্বরী নদীতে বিপদ সীমার উপর দিয়ে জল বইতে শুরু করল। ভেসে গেল সবংয়ের বিস্তীর্ন এলাকা। ঘন ঘন শঙ্খ ধ্বনি দিতে থাকলো এলাকার সকল মহিলা বৃন্দ। কিন্তু বিপদ এড়ানো গেল না। কপালোচন- কপালেশ্বরীর উত্তর বাঁধ ভেঙে গেল। ভেসে গেল সবংয়ের বিস্তীর্ন অঞ্চল। আমাদের গ্রামের সবাই প্রস্তুত যে কোনো মুহুর্তে বাঁধ ভেঙে যেতে পারে। আমাদের প্রতিবেশী বিহারীচক, বরদা আর দক্ষিণ নিমকী মোহাড় সহ আমাদের গ্রামের বড়োরা রাত জেগে বাঁধ পাহারা দিতে থাকল। আমাদের দক্ষিণ বাঁধের অবস্থা একটু ভয়াবহ। কি জানি কোত্থেকে শত শত সিমেন্টের থলে জোগাড় হয়ে গেল। থলের ভিতর মাটি ভরে গাঙটা দেওয়া হল বিপদ সম্ভাব্য জায়গায়।
আরও কয়েকটি দিন পর বৃষ্টি থামল, আকাশ পরিষ্কার হল, বিপদ সংকেত কিছুটা কমল। কিন্তু শুরু হল এক সংগ্রামের জীবন। ধানখেতের উপর কয়েক ফুট জল। বিনষ্ট হল মাদুর চাষ। পচে গেল সব ধরনের ফসল। এলাকা জুড়ে এক ভয়ংকর দারিদ্র্যতা। সংকট দেখা দিল পানীয় জলের। সরকার থেকে কিছু কিছু রিলিফ আসত গুড়, চিড়ে, বলাগা ঘাটা। কিন্তু পর্যাপ্ত পরিমাণ নয়।
এতো দুঃখের মাঝেও আমাদের জীবনে অনাবিল আনন্দের অনেক ঘটনা আজও আমার মনে আছে। কয়েক বর্গ কিলোমিটারের জল ভরতি মাঠে পুকুর ভেসে আসা রুই কাতলা, বোয়াল, ভেটকি মাছ ধরতে সবাই মজে যেত মহাউল্লাসে। প্রায় প্রতিদিনই বড়োরা বেরিয়ে যেত সকাল দশটা থেকে। কয়েক'শ মিটারের জাল পেতে দেওয়া হত। বেশ কিছু দুর থেকে কুড়ি পঁচিশ জন বাঁশ দিয়ে জলের উপর পেটাতে পেটাতে এগিয়ে আসত জালের দিকে। ভয়ে দৌড়ে পালানো মাছগুলো জড়িয়ে পড়ত জালে। এই পদ্ধতিকে আমরা বলতাম বিল বাড্ঢানো। দিনের শেষে সমস্ত মাছ ভাগ হতো অংশগ্রহণকারী সকলের মধ্যে। ঘরে চাল না থাকলে মাছের আর অভাব থাকত না।
বায়না করতেই কাকু বানিয়ে দিল কলার ভেলা। চার চারটা বড় বিচিকলার গাছ। স্বচ্ছন্দে চার পাঁচজনের ভর নিতে পারে। কলার ভেলা বাইতে বাইতে আমরাও মাঝ মাঠে পৌঁছে যেতাম। এই ভাবেই চলতে থাকল মাঠের জল শুকনো পর্যন্ত।
এই সময়ের একটি বিশেষ দিনের ঘটনা কোনো ভাবেই ভোলার নয়। সে দিন বাড়িতে তেমন কিছুই নেই। তাই প্রাতঃরাশ হল না আমাদের। একটু কলহ বিবাদের পর কিছু না বলেই একটা ব্যাগ হাতে বাবা বেরিয়ে পড়ল বাজারের পথে। আমরা সবাই জানি বাবার পকেট ফাঁকা। কারুর না কারুর কাছে হাত পাততে হবে। কোনো দোকানদার ধার দিলে কিংবা কোনো সুদখোর মহাজন কিছু টাকা ধার দিলেই কিছু আনতে পারবে। এই সময় এই এলাকার অনেক মানুষের অবস্থা কিছুটা বাবার মতোই।
প্রায় বেলা সাড়ে বারোটায় সময় বাবা ফিরে এল শুকনো মুখে। কিছু না বলেই গামছা পরে বেরিয়ে পড়ল বাড়ির পেছনের দিকে। খানিকক্ষণ পরে ফিরেএল মস্ত বড় এক কুমড়ো নিয়ে। ওজনে প্রায় পনেরো কেজির কাছাকাছি। বহু যতনে ঠাকুমা গাছটি লাগিয়েছিলেন। তাই ঠাকুমা খুব একটা সন্তুষ্ট হল না। কিন্তু কি আর করবে! অর্ধেক কুমড়ো রান্না হল নামমাত্র সরষে তেল, আর শুকনো লংকা দিয়ে।
আমরা দশজন গোল করে স্যাঁতসেঁতে মাটির মেঝেতে বসে আছি। মাঝে একটা হাড়িতে রাখা কুমড়ো ঘন্ট যেন মহার্ঘ্য মহাভোগ। ঠাকুমা সযত্নে এক এক করে দশটা থালায় বেড়ে দিলেন সেই অমৃত। আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ মহাভোজ।
সত্যিই আজ শরীর সায় দিলে প্রতিদিন, প্রতিবেলায় আমি বিরিয়ানি, পোলাও খেতে পারি। কিন্তু, সেদিনের সেই কুমড়ো সেদ্ধ আজও লেগে আছে আমার জিভে আগায়। পাঁচতারা হোটেলের সাত কোর্স বুফে আমার কাছে অতীব তুচ্ছ ঐ কুমড়ো সেদ্ধর কাছে।

0 মন্তব্য
আপনার মন্তব্য জানান