'চৌকাঠে পা রেখে 'কবি মানসী বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক কাব্যগ্রন্থটি সদ্য হাতে এসেছে ।
ইতিপূর্বে তাঁর আরো দুটি কাব্যগ্রন্থ 'এক টুকরো আকাশ' এবং 'নদীর যাপন কথা'
প্রকাশিত হয়েছে।
একদিকে তিনি যেমন কবিতা সৃষ্টিতে নিমগ্ন,
অন্যদিকে তেমনি কবিতার প্রয়োগ শিল্পের প্রতিও তিনি মনোযোগী।
একাধারে তিনি কবি এবং আবৃত্তি শিল্পী।
তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় বিগত কয়েক বছরের। তিনি অত্যন্ত সদালাপি এবং মিশুকে তাঁর আন্তরিকতায় কোন খাদ নেই। যে কাউকে আপন করে নিতে পারেন অল্প সময়ের মধ্যে সহৃদয়তার গুনে ; তাঁর এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করলাম এই কারণে,তাঁর কাব্য সৃষ্টিকে মূলত নিয়ন্ত্রণ করে এই প্রবণতা গুলি। যে কারণে তাঁর রচনা-
শৈলী তে বিশেষ জটিলতা নেই। অনুভবকে তিনি অকৃত্রিমভাবে প্রকাশ করতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। কবিতায় রহস্যময়তা একটি বড় গুণ; কিন্তু সে গুণারোপ করতে গিয়ে কবিতাকে অহেতুক দুর্বোধ্য করে তোলেন না। সরল ও জটিল দুই আঙ্গিকেই কবিতার সৌন্দর্য সৃষ্টি করা সম্ভব।
কবির ব্যক্তিগত প্রবণতাই সেই আঙ্গিক নির্বাচন করে নেয়। সে দিক থেকে কবির যে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছি তাঁর কয়েকটি কবিতা পাঠে তার সমর্থন মিলবে।
জীবনের নানা অভিজ্ঞতা, অনুভূতি গুলিকে কবিতায় রূপে দান করাই কবি ধর্ম। মানসী তাঁর এই কাব্যগ্রন্থে সেই চেষ্টা করেছেন।
বাস্তব ক্ষেত্রে থেকে তিনি যেমন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন তেমনই তাঁর কল্পনা বিলাসী মন ভাব জগতে ডানা মেলেছে। রবীন্দ্রনাথ
অনুষঙ্গে তাঁর 'সত্যম্ শিবম্ সুন্দরম'--------
কবিতাটি পাঠ করার পর কিছু সময় আত্মস্থ হয়ে রইলাম। পুত্রশোকে দগ্ধ হৃদয়ে কবি দেখলেন জ্যোৎস্নালোকে ভেসে যাচ্ছে চরাচর, কোথাও কিছু কম পড়েনি ! আলোচ্য কবির মনে প্রশ্ন জেগেছে ,'তবে কি কবির প্রিয় পুত্রশোক সত্য ছিল না ? কবির কাছে সত্য ছিল জোৎস্নাভরা মহাজাগতিক লোক ?'
কবি নিজেই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন।
'সত্য ছিল দুই ই.....'
"পুত্র শোক পার্থিব দুর্বিষহ চরম সত্য বোধ।
জ্যোৎস্না লোক অপার্থিব পরম সত্য যোগ।"
কবির সামগ্রিক চিন্তার পরিপূর্ণতা আমাকে বিস্মিত করেছে। এই জীবন সত্যকে উপলব্ধি করাই তো কবির শ্রেষ্ঠ অর্জন। কবির ভাবনা নানা দিকে ধাবিত। জগত সংসার, নিসর্গ,সমাজ,
ব্যক্তিজীবনের ঘাত- প্রতিঘাত, সুখ দুঃখ,বেদনা, বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে ধাবিত হয়েছেন একের পর এক কবিতায়;
এ যেন অবিরল ঢেউয়ের পর ঢেউ ধেয়ে আসছে পাড়ের দিকে ।কবিতা গুলি পড়তে পড়তে কত বিচিত্র অনুভবের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছি। কবি মন যেন সদাচঞ্চল অস্থির ।নিজেকে প্রকাশ করার জন্য উদগ্রীব ।একটি ভাবনার ধারন করতে করতে আরেকটি ভাবনা এসে ভিড় করে মনে। তাই নানা ভাবের কবিতা সংকলিত এই গ্রন্থে।
"বাউল আঙুলে ছুঁয়ে যায় প্রেম,
একতারা শুধু জানে।"
"শঙ্খ চিলের ওই শুভ্র ডানা ওড়ে হৃদয়ে গহীন গাঙ্গে।"
"আষাঢ় শেষের দুরন্ত নদী ওই ছোটে গাঢ় আলিঙ্গন সুখে।"-
পংক্তি কটি চয়ন করলাম 'প্রেম সুখ' কবিতা থেকে। চিত্রকল্পের মাধুর্যের জন্যই এগুলি চয়ন করা, কবির বিভিন্ন কবিতায় এমন
স্মরণযোগ্য পংক্তি ছড়িয়ে আছে।
'রবীন্দ্রনাথ ও মা'
কবিতাটিও----
বিশেষ ভাবে আকৃষ্ট করে। রবীন্দ্র সংগীত অনুষঙ্গে মাতৃস্মৃতি অবলম্বনে কবিতাটি। কবির মা রবীন্দ্রসঙ্গীতে অনুরক্ত ছিলেন।মা'কে গান শোনাবার জন্য টিউশনি টাকায় টেপ রেকর্ডের বা রেকর্ড প্লেয়ার কিনেছিলেন। মার অন্তিম পছন্দের গানটি ছিল "যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে ....."কবিতাটির মধ্যে দিয়ে এক বিষন্নতার রাগিনী জেগে ওঠে, যা কবিকে মথিত করে।
ভগিনী নিবেদিতা স্মরণে 'শ্বেতপদ্ম' কবিতাটিও স্মরণযোগ্য।
এই কবিতায় উল্লেখযোগ্য কটি পংক্তি:
'তুমি বৈশাখের তপ্ত হাওয়া, আষাঢ়ের মেঘে অশনি সম্পাত, তুমি শ্রাবণের সজল বৃষ্টি ফোঁটা ,তুমি শরতের নির্মল নীলাকাশ, তুমি হেমন্তিকার মায়া আলো,তুমি বসন্তের চঞ্চল মধুর পবন।
ভারতবর্ষের ঘরে ঘরে জ্বলে উঠল মঙ্গলদীপ তোমার
পরশমণি ছোঁয়ায়।'
'শহুরে বাঘ' এবং 'সরীসৃপ'----------
এই দুটি কবিতা ভিন্ন স্বাদের, ব্যাঙ্গ রসাত্মক। রচনা শৈলীও বেশ মজাদার। দু একটি পংক্তি এখানে তুলে দিচ্ছি: ' 'শহুরে বাঘ' :'একদিন একটা মানুষ এসে বাঘেদের নিয়ে এলো লালদীঘির ধারে....' বাঘ টা বলে চুপি চুপি এ শহরের আঁকে বাঁকে অনেক আফিম গাছ আছে। বাঘেরা তা চিনেও চেনে না আফিম খেয়ে রোজ ঝিমতে থাকে। আফিম পাতা চিবিয়ে ওরা হয়ে গেছে সব মিঁয়াও ব্যাটা। আমি শুধু খাইনি আফিম তাই মুখটা দেখেই চিনেছি নিজের স্বরূপ টা।' 'সরীসৃপ': ও কুমির তোর জল কে নেমেছি ,ধর তো দেখি! ধরতে পারলি না, দ্যাখ কেমন দিলাম ফাঁকি । এ বাবা ধরতে পারে না , কুমির ডাঙ্গায় উঠতে পারে না।'
ক্লিপিংস কবিতাটির সবটুকুই উদ্ধৃতি দিলাম। অংশবিশেষ উদ্ধৃতি দিলে কবিতাটি অনুধাবন করা যেত না। "চলে তো যাবেই, তুমি না চাইলেও স্রোত তোমাকে টেনে নিয়ে যাবে। কিন্তু যাবার আগে কিছু ছোট ছোট ক্লিপিংস রেখে যাও-- এমন কিছু ক্লিপিংস যা মানুষের চিন্তার চেতনার খোরাক। পেরেক ঠোকা তোমার কাজ নয় বরং তবলীয়ার হাতুড়ি হও, তম্বুরার টিউনিং পেগে রাখো হাত।"------------
কবিতাটির সবিশেষ ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। মানুষ পৃথিবীতে আসবে যাবে। কিন্তু তারই আসা-যাওয়া সার্থক যে পৃথিবীর বুকে আঁচড় কাটতে সক্ষম। মানুষ তাকেই মনে রাখে তার আসা-যাওয়াকে স্মরণ করে। বুদ্ধ পূর্ণিমা কবিতায় কবি জানাচ্ছেন গৌতম বুদ্ধ তিব্বত থেকে কাশ্মীর কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী কন্যাকুমারী থেকে বারানসি বারানসি থেকে ভুজে ছুটে বেড়াচ্ছেন পাগলের মত শান্তি বার্তা পৌঁছে দিতে মানুষের মনে তা পৌঁছয় না! পৌছলে পৃথিবীতে এত অশান্তি যুদ্ধ হত্যার ঘটনা ঘটতো না। ইতিহাস বারবার রক্তাক্ত হোতো না। দেশে দেশে সংঘর্ষ বাধতো না। দাঙ্গা বঁধে উঠতে পারে না।
মানুষকে ধ্বংসের প্রহর গুনতে হতো না ।ধর্ম সহিষ্ণুতার পরিবর্তে মানুষকে অসহিষ্ণু করে তুলেছে। পৃথিবী রক্তাক্ত হচ্ছে বারংবার। বাংলা ভাষার প্রতি দরদে বাঙালি হয়ে তার আক্ষেপ ফুটে উঠেছে 'ভাষা জননী' কবিতায় : 'অসম দেখালো পথটা, আমরা শিখতে পারিনি। বাংলা এখনো হাঁটে না, উনিশে একুশে জাগে নি।' বাংলা ভাষার জন্য যে আন্দোলন হয়েছে বাংলাদেশে এবং অসমে এপার বাংলায় তা হয়নি এখানে বরং আমরা তৈরি করেছি সংকর ভাষা 'হিংলা বা ইংলা।' শুদ্ধ বাংলা বলা লোকের সংখ্যা ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। নতুন প্রজন্মের বাংলা শেখা কমছে। যারা বাংলা ভাষাকে এখনো অন্তর থেকে ভালবাসেন, তাঁদের মধ্যে বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ উৎকন্ঠা জন্ম নিচ্ছে।
আলোচ্য কবি ও সেই মুষ্টিমেয় বাঙালির একজন ।তাই তাঁর বাংলা ভাষার জন্য আক্ষেপ থাকা স্বাভাবিক। কবির এই কাব্যগ্রন্থে বিষয় ভাবনার বৈচিত্র অবাক করার মতো। বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে চলে গিয়েছেন একের পর এক কবিতায়। রচনার আঙ্গিকেও বৈচিত্র আনতে সচেষ্ট থেকেছেন। সচেষ্ট থেকেছেন কখনো ছন্দে কখনো টানা গদ্যে লিখতে। তিনি এতটাই আবেগ তাড়িত কবি কবিতা রচনার ক্ষেত্রে তাঁর কোন বিরতি নেই। ফলে কোনো কোনো কবিতার ক্ষেত্রে মনোযোগ বিঘ্নিত হয়েছে। ভাবের পারস্পর্য হোঁচট খেয়েছে কোন কোন ক্ষেত্রে। কবিতা যেভাবে জলস্রোতের মতো তাঁর কলমে উঠে এসেছে সেগুলিকে বিধৃত করতে গিয়ে পরিমার্জনের দিকে নজর দিতে পারেননি। কবিতা গুলি সুবিচার থেকে বঞ্চিত হতো না কবি যদি আরো আত্মস্থ হতেন। এসব ত্রুটি থাকলেও তাঁর কবিত্ব কে খাটো করা যায় না। তাঁর চিন্তার জগত যথেষ্ট বিস্তৃত। ভাব প্রকাশ করার ভাষা ও তাঁর আয়ত্তে। স্বভাবতই তিনি জটিল বিন্যাসের পক্ষপাতি নন ; ফলে পাঠক দুর্বোধ্যতার অভিযোগ আনতে পারবেন না। তাঁর কবি প্রতিভার দিকে আগামী দিনগুলো তাকিয়ে থাকবে। কারণ তিনি কবিতা না লিখে থাকতে পারবেন না। বলা যায় তিনি প্রতিমুহূর্তের কবি। বিপুল আগ্রহ আর সৃষ্টির উন্মাদনা তাঁকে অবশ্যই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে দেবে।

0 মন্তব্য
আপনার মন্তব্য জানান