শারদীয়া সংখ্যা ১৪৩২ | প্রকাশ: 27 September 2025 সম্পাদক: মলয় মজুমদার
গল্প

এক লেখোয়াড় সমাগম কথা

-- নীলিম গঙ্গোপাধ্যায়

এক লেখোয়াড় সমাগম কথা
27 Sep 2025
157 Views
0 0
Share:
Responsive Ad Unit (e.g., 728x90 or 320x100)

প্রিতমের ছেলের বৌভাতে যেতে হবে মনে করিয়ে দিল প্রিতমই। ঠিক বৌভাতের দিন, বেলা বারোটায়। এক্কেবারে ভুলে গেছিল কাবুল। বিরক্তই হলো খানিক। দিনটাকে ইতিমধ্যে বিভিন্ন প্ল্যান প্রোগ্রামে ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছিল সে। ভেবে রাখা প্ল্যান ভেস্তে গেলে ভিতরের খ্যাঁচাবুড়ো প্রকট হয়ে ওঠে আজকাল। তিন মাসের পেপার বিক্রি, এক মাসের ওষুধ কেনা, ব্যাঙ্কের পাসবইয়ে কয়েক মাসের ট্রাঞ্জ্যাকশন আপটুডেট, ইত্যাদি তিন প্রকার কাজে যাওয়ার মানসিক প্রস্তুতি মস্তকধৃত করে গ্যারাজের দিকে যাচ্ছিল কাবুল গাড়ি বের করতে।                                                                                                                                            বিক্ষিপ্ত মনটাকে শান্ত করল একসময়। গাড়ি স্টার্ট করার আগে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো প্রিতমের ডিজিটাল ই-কার্ড, আছে না মুছে ফেলেছে চেক আপ করতে, পেয়েও গেল। পিরিং পিরিং মিউজিক বাজানো ই-কার্ড পাতা খুলে খুলে পাত্র-পাত্রী, ম্যারেজ হলের ঠিকানা, ল্যাণ্ডমার্ক দেখাল। হ্যাঁ, মাস খানেক আগে নেমতন্ন সেরে রেখেছে প্রিতম। কাবুল গাড়ি ছাড়ল মোষের মতো দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে।                                    আসলে কফি হাউসের সার্কেলচ্যুত হওয়ার কারণেই এমন ভুলে যাওয়া। মঙ্গলবারের আড্ডায় গ্রুপের বাকিরা হাজিরার ব্যাপারে একই রকম নিয়মনিষ্ঠায়। বিগত  কয়েক দশক ধরে একটানা। কাবুলেরই শুধু মনে হয় ব্যয় করার অত সময় নেই। আর দেওয়া যায় না। এই বয়সে সময়ের এতটা বরবাদ, অতটা ক্ষয়, মেনে নিতে পারে না সে। দেড় ঘন্টা আড্ডার পিছনে চার-পাঁচ ঘন্টার টু এণ্ড ফ্রো বাসজার্নি, সপ্তাহে একদিন হলেও সম্ভব নয়। কিন্তু গ্রুপে হাজিরা না দিলে যেমন হয়, ব্যাঙ্কের পাসবইয়ের মতো সবকিছু আপটুডেট থাকে না। সে ভুলতে থাকে কফিহাউস। ফেড হয় ইতিবৃত্ত। পৌঁছয় না ঘটমান বর্তমান। তাকেও ভোলে অনেকে। সেও ফিকে হয় বৃত্তের কাছে, অনেকের কাছে।   

 

In-article Ad Unit

পাড়া ছাড়ানো রাস্তার ফাঁকায় কেনার দোকান দিয়েছে, সবকিছু কিনে নেওয়া একটি পরিবার। যতটা গরিব দেখায় ততটা নয়। কাছাকাছি গ্রামগঞ্জে বাড়িঘর জমিজমা, বোঝা যায়। গুমটি আর পলিথিন দিয়ে বেশ খানিক জায়গা দখল করে নিয়েছে তারা। তাদের থাকাথাকি, কেনাকিনি, রান্নাবান্না, শোয়া-বসা সব সেই পলিথিনের ঘেরাটোপে। দোকানে দোকানদারনি থাকলে গল্প জুড়ে সময় অতিবাহিত করা কাবুলের পুরনো অভ্যাস। নিছক কৌতূহল থেকে। তথ্যের সন্ধান, গল্পের প্লট, মিশতে পারার পরীক্ষা, ইত্যাদি মিশ্র বিষয়, মানসিকতা, তাকে তাগিদ দেয়।

 

পৃথুলা মহিলা একেবারে ফিফটি-ফিফটি হিন্দু-মুসলমান। কাবুলের রেটিং তাই। কড়াইয়ে খুন্তি ঠনঠনিয়ে এই সময়টায় চচ্চড়ি নয় শুক্তো, নয় পুঁইশাক, এর বাইরে কিছু না। কাবুলের প্রশ্নের উত্তরে মুচকি হেসে বিবরণ দেন। হাসি দেন কাবুলের কাণ্ড দেখেও। গাড়ির ডিকি থেকে পনের আঠারো টাকার বেশি কাগজ সে আনতেই পারে না। তার থেকে বেশি টাকার তেল পুড়িয়ে তাই নিয়ে চলে যায়। প্রিতমের ছেলের বৌভাতে যাওয়া উচিত। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলায় কাবুলের ভিতরকার খুচরো খ্যাঁচখ্যাঁচানি উধাও। বন্ধুসমাগমের কথা ভেবে কিছুটা ফুরফুরে। 

 

-- এইযে ফতেমা ম্যাডাম, কেবল ডাঁটাচচ্চড়ি রানলে হবে? গোস্তের গন্ধ তো একদিনও পেলুমনি?

কাগজের থলি হাতে, পলিথিন ঘেরা ব্যবসা কাম রান্না এলাকায় ঢুকে পড়েছে কাবুল। সবজি কাটা চলছিল পুঁই কুমড়ো বিন-টিন ছড়িয়ে। মহিলা উঠে দাঁড়ান ঘোমটা টেনে। ঘোমটা দুটি কানের পিছন দিয়ে টাইট করে টানা। বাঙালি বধূদের মধ্যে এটি মুসুলমানি ঘোমটা। ঘোমটার আবার হিন্দু-মুসুলমান। কাবুলের মধ্যে জেগে ওঠা কৌতুক নস্যাৎ করে মহিলা বলেন,

-- গোস্ত খুব কম খাই। হজম করতি বাধে। শাকপাতা ভালো। আর তোমারে কে কইচে মোর নাম ফতেমা?

-- ওই হোলো কান ঢাকা ঘোমটা থাকলে প্রতিমা, কান দেখানো হলে ফতেমা। সামান্য তফাত। তুমি চাইলে তোমায় প্রতিমাই বলবো। 

কাবুলের হাত থেকে খবরকাগজের থলি নিতে নিতে হাসিতে জোর দেন মহিলা। কাবুলের দিনটা ধবধবে হয়।

 

গাড়ি ড্রাইভ করে গেলে সময় বাঁচে, বন্ধুদের তারুণ্য প্রদর্শন করা যায়। কিন্তু ওসিটি করে তবে ডাক্তারকে চোখ দেখাতে হয়। ডান চোখে তিনটে ইনেজেকশনের নিদান পালন হয়ে গেছে। বামপন্থী বলেই নাকি বাঁ চোখটা এখনো ঠিকঠাক। ডান চোখের দৃষ্টিপাতকে চোখের ভিতরে জন্ম নেওয়া ঘষা কাচ আটকে দিচ্ছে বছর দুই। সন্ধ্যে রাত্তিরে বিপরীতমুখী  গাড়ির আলো ছুরির মতো ছুটে আসে। ছানি পড়লে নাকি চোখ গাড়ির আলো সহ্য করতে পারে না। কিন্তু ডাক্তার ছানি খুঁজে পায় না, বললেও। অবিশ্বাস্য লাগে কাবুলের। এয়ারপোর্টের নারকীয় ভীড় পেরিয়ে বিরাটি যাওয়া আসা রিস্কি হয়ে যাবে। বাড়িতে কথার অবতারণা করে কাবুল,

-- একার না দুজনের ইনভাইটেশন বুঝতে পারছি না। বুদ্ধ,উজ্জ্বল, ওরা বউ নিয়ে যাচ্ছে। তুমি যাবে?

-- ইনভাইট করেছে কিনা না জেনেই চলে যাবো? ভাবলে কী করে?

-- বেশ যেতে হবে না। ভাবছি গাড়িটা নিয়েই যাই। আগেও তো বিরাটি গেছি।

-- ওই চোখ নিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাবে রাত্তিরবেলায়? সেটাই বা ভাবছো কী করে?                                  এত ভাবাভাবির প্রশ্নে ঠেলে দেওয়া মানে কাবুলের পারমিশন নেই।

 

সন্ধ্যের অফিস ভাঙা বাসে বাড়ি ফেরা তরুণীদের সংখ্যাধিক্যের ঠাসাঠাসি ঠাহর করে কাবুল। বসে বা দাঁড়িয়ে, মোবাইলে নেট নিমগ্ন তারা। দণ্ডায়মান একটি ছোট্ট চক্রবূহ্যের মধ্যে পড়ে যায় সে। বাসের ঝাঁকুনিতে পান থেকে সামান্যতম চুনও যেন না খসে, সেরকম সতর্কতায় মহিলা সহযাত্রীদের ঘেরাও নৈকট্যে সঙ্কুচিত দাঁড়িয়ে থাকে কাবুল। গাড়ি আনলে এই চাপ নিতে হতো না।

 

বিরাটি মিনি বাসস্ট্যাণ্ডের কাছেই সাবিত্রী ম্যারেজ হল। এগোতেই যেন পোঁটলা খুলে বেরিয়ে এলো বিস্মৃত, কিন্তু এককালের অতি পরিচিত টপোগ্রাফি। একেবারে চেনা রাস্তা, চেনা পথের বাঁক। সগাড়ি সস্ত্রীক কাবুল এসেছে কয়েকবার। ওই তো বাঁ দিকে আরেকটু এগিয়েই সুবীরের এলাকা। একটা ছোট সভাঘরও আছে ওদিকটায়। পত্রিকা উদ্বোধন, বই প্রকাশ, সাহিত্যসভা, সুবীর ভালোবেসেই ডেকেছে। তার আমন্ত্রণে এসেছে। বারবার। পরবর্তীকালে ওই আমন্ত্রণ, আপ্যায়ন, পাঁঠাকে বটপাতা খাওয়ানোর সঙ্গে পুরোপুরি তুলনীয় করতে, মন চায় না এখনও। মুখচোখে কথাবার্তায় অতখানি উছলে ওঠা বন্ধুত্বের পুরোটাই খাদ হতে পারে না। 

 

প্রিতম দাঁড়িয়ে ছিল ম্যারেজ হলের কাগজফুল গেটে। সঙ্গে লেখক শান্তনু গঙ্গাহৃদি। সর্বাধিক বিক্রিত না হলেও, বহুল প্রচারিত সংবাদপত্রে কাজ করতো প্রিতম। কম বয়স থেকে তার গল্প উপন্যাস লেখালেখি। ছোটদের, বড়োদের। ফাঁকি না-মারা লেবারের নিষ্ঠায়, দেদার। লিটিল ম্যাগাজিন আর খবরের কাগজের পশ্চাতদেশে মুদ্রিত হয় তার লেখা। জ্বলজ্বল করে নাম। ভিনরাজ্যের বাংলা কাগজেও। লেখালেখির লোকেরা অনেকেই জানে তাকে। কিন্তু যারা লেখে না, এমনকি পড়েও না, সেই সব লোকেদের মধ্যে নাম সেঁধিয়ে দিতে না পারলে তো আর খ্যাত হওয়া যায় না। খ্যাত বলাও যায় না। কিন্তু আবার এই প্রিতমের তুলনায় কাবুল নিজে অবশ্য অনেকটাই কম। যাকে বলে মোটেও না। দু-চারটি লিটিল ম্যাগাজিনে বাৎসরিক দু-চারটি গল্প কবিতার বেশি কিছু ছাপিয়ে উঠতে পারে না সে। ওই কফি হাউসের সাপ্তাহিক আড্ডায় গিয়ে উঠতে পারে না যেমন। ইদানিং সব ব্যাপারেই ক্লান্তি বোধ। ভস্মে ঘি ঢালা ফিলিংস। স্রষ্টার ভূমিকায় হেদিয়ে মরার চেয়ে অপেক্ষারত সৃষ্টি উপভোগ শ্রেয় মনে কোরে নেটফ্লিক্স খুলে বসে থাকে।                                                                                                                                               তবে প্রিতমের অধিক পরিচিতির কারণে বৃত্তের বাইরেরও সমসাময়িক একঝাঁক লেখালেখির লোকের সঙ্গে আজ মোলাকাত হবে সেটা বুঝে নেয় কাবুল। আর তারা সবাই যে তাকে চিনবে, বা একেবারেই চিনবে না, তেমনটা নয়। অনেক পরিচিতই আসবে অপরিচিতদের পাশাপাশি। একটা মনোমত গেট টুগেদার হবে। এই প্রকার পূর্বভাবনার উৎসাহ আজ নিশ্চিত করেছে তার আগমন।

 

গঙ্গাহৃদিকে দেখেই প্রথম উৎফুল্ল হয়ে ওঠে কাবুলের চিত্ত। গঙ্গাহৃদি বরাক উপত্যকার প্রতিনিধি। ভাষা সৈনিক বলে না, সেই রকম। তার পত্রিকার নাম উনিশে মে। মাসখানেক আগে শিলচরের শিল্পী সাহিত্যিক আবৃত্তিকার জুটিয়ে তারা সল্টলেকে অনুষ্ঠান করেছিল। কাবুলকে ফোন করেছিল অংশ নিতে। সেও যে বিরাটিতে থাকে ভুলে গেছিল কাবুল। মনে পড়ায় ফের সুবীরের কথাও মনে পড়ে। তাহলে বিরাটিতে তার পরিচিত লোকেদের সংখ্যা কমেছে কিন্তু শেষ হয়নি।

 

দাদার জন্য কিছুটা বিব্রত বোধ করলেও সুবীরের বোন ভক্তই হয়ে পড়েছিল। সুবীর চলে গেছে। কিন্তু তার বোন, বউ, মস্তান ছেলেরা তো এই বিরাটিতেই আছে। আর আছে ঘন ঘন বাংলাদেশ যাওয়া কাবেরী। সেও পত্রিকা চালায়। বাংলাদেশের লেখকদের সঙ্গে বেশ যোগাযোগ রাখে। সেখানে কবি নির্মলেন্দু গুণের বাড়িতেই থাকে যেন। কখনো সখনো এই বাংলায় আসে, এরকম।                                                সুবীরও খুব বাংলাদেশ যেত। ওখানে পত্রপত্রিকায় লিখত। ওখান থেকে লেখক কবিরা আসা যাওয়া করত তার বাড়িতে। বেনজিন খানের কথা মনে পড়লো। যশোরের চিন্তক। বেশ কিছুটা ধর্মীয়। কিন্তু বাড়ির অনেকটা এলাকা নিয়ে লাইব্রেরি, পাঠাগার, মঞ্চ, সেমিনার, গল্প কবিতা, প্রবন্ধ পাঠ, সঙ্গীত  অনুষ্ঠানের আয়োজন। ব্যবস্থাপক হিসেবে বেনজিন যশোরে এক প্রতিষ্ঠান। সুবীরের সূত্রেই আলাপ। এসেছিল কাবুলের বাড়ি। রাত্রে ছিল। না থাকলে একজন গোঁফদাড়িযুক্ত শা-জোয়ান স্নানের আগে তার কোমর ছোঁয়া দীর্ঘকেশ পরিচর্যাকালে কেমন দর্শনীয় অর্ধনারীশ্বর হয়ে ওঠে জানা হতো না। কিন্তু যশোরে তার অ্যাকাডেমিতে কাবুলের আর যাওয়া হয়নি। যা কিছু দেখা জানা, ফোন আর ফেসবুক থেকে। 

 

বিরাটিতে কাবেরী আছে ভাবনায়, স্মৃতির কলসি উপুড় হয়ে ঠনঠন মোহর পড়ে। বার দুয়েকের বেশি কাবুলের আসা হয়নি তার বাড়ি। সুবীরের কথায় এককালের অসাধারণ সুন্দরী কাবেরীর গায়ের রঙ ছিল দুধে-আলতা। প্রকৃতির খেয়ালিপনায় কাবেরী যখন ঘন সবুজ, সন্তানাদি বড়, আর ঘন ঘন সবুজ বাংলাদেশে যায়, কাবুলের সঙ্গে আলাপ সেই পরবর্তী পর্বে। কাবেরীও তার বাড়িতে পত্রিকা প্রকাশ অনুষ্ঠানে ডাকতো। ডেকেছিল। দোতলা বাড়ি। অনুষ্ঠান শেষে ছাদে ওঠা। লাইট জ্বালতেই ঝকমক করে উঠেছিল দোতলা বাড়ির মাথা ছাড়িয়ে যাওয়া আমগাছ। অদ্ভুত সুন্দর লম্বাটে গড়নের বেড়ে ওঠা সবুজ আম। কাবেরী ছাদের রেলিংয়ে হেলান দিয়ে আমের জাত বোঝাচ্ছিল। পাতার সবুজ, আমের সবুজ, কাবেরীর দেহবর্ণের সবুজ, সব একাকার হয়ে একটা অলৌকিক ভাইব যেন ছাদ-লাইটের সহযোগিতায় গ্রাস করতে চাইছিল কাবুলকে কাবেরী যখন বলল,

-- আমের এই জাতটাকে বলে কলাবতী। পাকতে আর ক-দিন। এসো না আম খেতে। চমৎকার স্বাদ। ইনভাইট করে রাখলুম।

 

সেই নিমন্ত্রণ রেলিশ করতে করতে বিরাটিতে সুবীরের সভায় যাওয়া আসা হয়েছে। কিন্তু কাবেরীর গাছের কলাবতী আমের সময় পেরিয়ে গিয়েছে, যাওয়া হয়নি। পরবর্তী ঋতুর জন্য অপেক্ষা ছাড়া গতি নেই। এমন ভেবেই হয়তো পেরিয়েছে আরো দুটি ঋতুচক্র। আর একদিন হঠাৎ, কাবুলের থেকে বেশ খানিক ছোট কাবেরীর বরের ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকে চলে যাওয়া শুনেছে তখনো না যাওয়া সুবীরের ফোনে। তারপর থেকে সবুজ গাছপালা, বনানী, অরণ্যের আয়তন, এমনকি ক্যাকটাসও, শুধুমাত্র স্মৃতির ক্যাটালিস্ট। সবুজ কাবেরী আর তার দ্বিতলবাড়ি সমান উচ্চতার সবুজ কলাবতী আম মনে পড়িয়ে দেওয়া। কাবুলের স্মৃতিতে যে আমের পরিপক্কতা পরিণতি না পাওয়াতেই থেমে যাওয়া, বা হঠাৎ বৈশাখীঝড়ে ঝড়ে পড়া। 

 

সুকুমার রুজের মোটরসাইকেল এসে থামল। চটপটে করিৎকর্মা লেখক। দুহাতে লেখে। সুদর্শন। সুদূর মফঃস্বল শহরগুলির লেখকবৃত্তেও জনপ্রিয়তা এবং যাতায়াত। নিজের পুরনো শহরের বইমেলায় গিয়ে সুকুমারের ক্যারিশমা দেখে বিস্মিত হয়েছিল কাবুল। ঘরসংসার, অফিস, লেখালেখি সামলেও সে কলকাতা থেকে মাঝে মাঝে এসে মফঃস্বলের মহিলাদের কলহাস্যকে সময় দিতে পারে। প্রমাণ পেয়ে পৌরুষ খাটো হয়েছিল কাবুলের। সম্পাদক বলল সব ঠিক আছে কিন্তু পুরনো লেখা গছিয়ে দেয়। শুনে কাবুল মন্তব্য করল না। পুরনো লেখা গছিয়ে দেবার ব্যাপারটাকে অতি মাত্রার অন্যায় মনে করে না সে। বিশেষ করে অঞ্চল ভিত্তিক লিটিল ম্যাগাজিনের লেখকদের ক্ষেত্রে। অধিকাংশ ছোট পত্রিকার নিজস্ব ভৌগোলিক সীমা থাকে। একটি ভালো লেখার সীমা অতিক্রম করে ছড়িয়ে পড়ার প্রয়াস কতটা আর অযৌক্তিক হতে পারে।

 

দ্বিতলে উঠে আসার পর সুকুমার একজনের সহায়তায় গিফট প্যাক বাঁধা শুরু করল। নীল সেলোফেন পেপারের ভিতরে তাঁর নিজেরই তিন-চারখানি আড়াইশো তিনশো পাতার বই বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না। লেখকের উপহার এমনটাই হওয়ার কথা। এই সিদ্ধান্ত যুক্তিনির্ভর। একজন লেখক প্রিয়জনকে নিজের প্রিয় জিনিস দেবে এব্যাপারে দ্বিমত থাকার অবকাশ নেই। বই করতে খরচ হয়। লেখককে নিজের বইও কিনে আনতে হয়। বইপড়া অভ্যাসের থিতিয়ে যাওয়া, বা অনভ্যাসের মাধ্যমে লোপাট হয়ে যাওয়া থেকে পুনরোদ্ধারের চেষ্টাও নিহিত থাকে। সবথেকে বড় যুক্তি খ্যাতনামাদের বই না দিয়ে, নিজেরগুলি দিয়ে নিজের পাঠকবৃত্ত বাড়াবার প্রচেষ্টা। কোনোটাকেই খাটো করা যায় না। কাবুল সমর্থন করে সমর্থনযোগ্য বলেই। কিন্তু তবু তার মন তাকে উদ্বুদ্ধ করে না। সে দেখেছে লেখকরাই সহলেখকদের বই দায়ে না পড়লে পড়তে চায় না। বাড়ির লোক আত্মীয় স্বজন কেউ পড়তে চায় না। পাঠ বিনোদন ব্যাপারটা একেবারে তলানিতে। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম, রিল, একের পর এক নেট সংস্কৃতি এসে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করে দিতে চাইছে বই-পড়াকে। বাড়িতে বই রাখা নিয়ে লেখকদের একটা পর্যায়ে সাংসারিক অশান্তি শুরু হচ্ছে। বই বিদায় করার পরিকল্পনা, প্রস্তুতি এবং অনুযায়ী, কাজ শুরু হচ্ছে। কাবুল চায় না যে উপহারের প্যাকেট খুলেই প্রাপকের মুখ বিরক্তিতে ভরে উঠুক। তার সৃষ্টিকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য অধিক, ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখুক সদ্য বিবাহিত কোনো দম্পতি। বা প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছনো বিবাহবার্ষিকীর কোনো যুগল। কাগজওয়ালার কাছে বিক্রি করে দেওয়ার জন্য নিক্ষিপ্ত করুক পুরনো পেপারের ডাঁইয়ে। পছন্দ করবেই এমন অন্যান্য উপহার সামগ্রী খুঁজে আনবার সময়ই বা কোথায়। তাই সব সে বড়া রুপাইয়াই দেবার মনস্থ করে ইদানিং। যা খুশী কিনুক তাই দিয়ে কড়াইশুঁটি বা কনডম, আনকনডিশনাল যাচ্ছেতাই। 

 

সুকুমারের সঙ্গে লেগে থাকা জনা দুই, লেখকই হবে, অচেনা কাবুলের। পরিচয় করলে হয়, না করলেই বা কি, গোছের উভয়পক্ষ মনোভাব। কারণে, কথাবার্তা পরিচয় কোনটাই হয়ে ওঠে না। কাবুল রিশেপশনের জায়গাটা জরিপ করতে থাকে। দোতলায় উঠেই মুখোমুখি বর কনে বসার ছোট প্লাটফর্ম। একপাশে নিমন্ত্রিতদের জন্য সাজানো চেয়ার। আরেক পাশে কফি কোল্ড ড্রিংকস স্টার্টারের পাশাপাশি টেবিল। বর স্যুট টাইয়ে সজ্জিত হাজির হয়েছে। কনের ব্রাইডাল মেকাপের সম্ভবত সামান্য বাকি। এসে পড়বে। ফটো শুট করার দল হাজির।

 

ওদিকে স্টার্টারে লোকজন যেতে এবং খেতে শুরু করেছে। এদিকে চেয়ারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গল্প করছে কিছু। তার মধ্যেই প্রিতমের মেয়েকে দেখতে পায় কাবুল। যাকে কয়েক বছর ধরে ফেসবুকের মাধ্যমেই জানে। না, সে কাবুলের মুখপুস্তিকা বন্ধুবৃত্তের নয়। প্রিতম, আমার মা আমার মা করে মেয়ের ছবি দেয়। কুমোরটুলির প্রতিমার মতো মেয়ের মুখ। কুমোরটুলির মতোই কোঁকড়ানো চুল। এমন মেয়েকে বাবা মা-মা করবেই। আবার মেয়ে যদি স্কলারশিপ জুটিয়ে বিদেশে পড়াশোনা করতে যেতে পারে তাহলে বাবার গর্ব তো সীমাহীন হবারই কথা। তো এই মেয়েকে সেই জার্মানে পড়তে যাওয়া থেকেই জানে কাবুল। প্রিতমের ফেসবুক পোস্ট, কফিহাউসে আড্ডা আর ফোনাফুনি থেকে। গবেষণা পড়াশোনার পাশাপাশি সেখানে টিউশনি করেও ভালো অর্থ উপার্জন করা যায়। মেয়ে করেও। ইংলিশ টিউশনের ডিমাণ্ড আছে জার্মানে। মেয়ে সেখানে দেশী বিদেশীদের মাঝে ভারতনাট্যম পরিবেশন করে। প্রিতম ফেসবুকে ছবি দেয়। আমার মায়ের নৃত্যশৈলী ক্যাপশান লিখে পোস্ট করলে, কাবুল কমেন্টে আমাদেরও মা লেখে। যথারীতি ভাবে এই মেয়ে তার দ্বিতীয় সন্তান হতে পারতো। প্রিতমের পোস্ট করা মেয়ের নাচের বিভিন্ন ভঙ্গিমা ছবি কাবুল ডাউনলোড করে। এডিটে নিয়ে গিয়ে ক্রপ করে, আরো আলো মেশায়। ভালোভাবে এনলার্জ করে, ফ্রেমিং করে, প্রিতমকে হোয়াটসঅ্যাপ ট্রান্সফার করে দেয়। প্রিতম খুব খুশী হয়। সে মেয়ের সেই বড়ো আর আরো আলোকিত ছবি ফের পোস্ট করে বন্ধু কাবুলের নাম দিয়ে। এইভাবে মেয়েকে নিয়ে তাদের গঠিত পিতৃত্ব বৃত্ত মাঝে মাঝে সজীব হয়ে ওঠে। তো সেই মেয়ে ওই ইতস্তত বসে থাকাদের সঙ্গে চেয়ারে। লাইন দিতে হবে না প্রতিমা বসেই আছে। জার্মান থেকে ফেসবুক থেকে সোজাসুজি বিরাটিতে। কাবুল সময় নষ্ট করে না। বুদ্ধ আর উজ্জ্বল এখনো আসেনি এই গ্যাপটার সদ্ব্যবহার করে নিতে হবে। সোজাসুজি জটলায় গিয়ে বলে

-- এই উঠে আয়। তো সঙ্গে গল্প করবো। 

বিদেশ বিভূঁই ঘোরা মেয়ে কি আর ঘাবড়ায়। সে অপরিচিত কাবুলকে পিতৃবন্ধু এবং এরকম কথা বলার অধিকারী বলেই মেনে নেবার একগাল হাসি দেয়। কাবুল তবু তার সেই ছবিগুলি আরো প্রেজেন্টেবেল করার ব্যাপারে তার ভূমিকার কথা বলে, মনে করিয়ে দেয়। তারপর বলে,

-- তোরা তো যমজ ! তাহলে তুই বাদ পড়লি কেন?

-- কিসে বাদ পড়লাম?

-- বিয়ে থেকে? মেয়েদের তো আগে বিয়ে দেয় বাবা-মা। তোর সমবয়সী ভায়ের বিয়ে হয়ে গেল, তোর হল না যে বড়ো? বাবা-মা চাপ দিচ্ছে না? 

প্রিতমের যমজ ছেলেমেয়ে, এবং তাদের যৌথ ভাবে তিরিশ বছর বয়স হয়ে যাওয়াটাও কাবুলের কাছে বিস্ময়কর, কৌতুককরও। দুজনের একজন পুত্র, যে দেশে বিরাটির বাড়িতেই থাকে যার আজ বৌভাত। আরেকজন এই মেয়ে যে জার্মানে থাকে গবেষণা করার স্কলারশিপ নিয়ে। টিউশন করে শুধু বাড়তি খরচ তোলে না, পয়সাও জমায়। ইণ্ডিয়ান স্টুডেন্টদের অ্যারেঞ্জ করা কালচারাল প্রোগ্রামে যোগ দেয়। বিদেশকে দেশ দেখায়।

   

-- তাই আবার দিচ্ছে না! আমি বলেছি, বিয়ে-টিয়ে এখন হবে না। পড়াশোনা শেষ করে একটা পছন্দসই চাকরি জোটাবো, তারপরে ভাবনা-চিন্তা করতে পারি। 

-- এক্কেবারে। দুম করে বিয়ে করে বসবি না। অনেকদিন মিশবি, ভালোমন্দ বুঝবি, তবে বিয়ে করবি।

-- ঠিক বলেছ।

কাবুল বলতে বলতে ভাবে প্রথম দেখায় নিজের মেয়ের থেকে বেশ কিছুটা ছোট মেয়েকে এরকম বলাটা বাড়াবাড়ি নিশ্চয়ই। কিন্তু কত অগ্রসর আজকের প্রজন্ম। মেনে নিচ্ছে গায়ে পড়া অ্যাডভাইস। বিরক্তি বিরূপতার সামান্যতম অভিব্যক্তিও নেই। কথার মাঝেই ভারতনাট্যমের ছবি থেকে বারবার বেরিয়ে আসে মেয়ে। কাবুলের নিজের মেয়েও। কাবুলের মেয়ের ঝলমলে নাচের পোশাক পরিবর্তিত হয়ে যায়। এক সাঁইত্রিশ বছরের মেয়ে তার দশ বছরের মেয়ের আঙুল ধরে হাঁটতে থাকে ফুটপাতে। স্কুল নিয়ে যাচ্ছে অথবা স্কুল থেকে ফিরছে। কোন দেশে বোঝা যাচ্ছে না ছবিতে। পৃথিবীর ফুটপাত। মেয়ে একা। মেয়েরা একা। হাজব্যাণ্ড ছেড়ে গেছে। বাবা ছেড়ে গেছে। বলা যাবে না। তারা ছেড়ে এসেছে বলবে মেয়ে। কাবুল নিজের হেঁটে যাওয়া মেয়ের থেকে ফিরে আসে প্রিতমের মেয়ের কাছে। আরো কিছু বলতে চায় যেন। কী বলবে ভাবার মুহূর্তে, বুদ্ধ আর উজ্জ্বল সস্ত্রীক সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসছে দেখতে পায়।

 

ষোল কলা প্রায় পূর্ণ হবার মতো। কফিহাউসে প্রিতমের রেগুলার আড্ডার দোসর ওরা। ওয়াদা নিভানার ব্যাপারটা দ্রুততায় কার্যকরী করতে সচেষ্ট হয় প্রিতম। কারণ সন্ধ্যা নিশীথে ঢলেছে। সবাইকে ফিরতে হবে। গণেশ পুজোর প্রসাদ দেওয়ার মতো স্টার্টার কাউন্টার। তার পাশেই দরজা ঠেলে ছোট রুম। রুমে খাট আলমারি বাথরুম। আলমারিতে প্রিতম ষ্টক রেখেছিল। গোটা পাঁচেক গ্লাস এল শরবতের কাউন্টার থেকে। এবং পাতার বাটিতে নির্ঝোল চিকেন। এত ভালো আয়োজন। লেখকরা আপ্লুত। কাবুল দু-এক পাত্র নেবে মনস্থ করেছে। কিন্তু মাপ সম্পর্কে সচেতন। সুকুমার তার উজ্জ্বল উপস্থিতি দিয়ে হাল ধরলো তরণীর। গেলাসে গেলাসে তরল। বাটিতে বাটিতে চিকেন। হাতে হাতে গেলাস বাটি।

 

-- এই সমরদা আসবে না? কেউ একজন গন্ধভারী ঝাঁঝালো বাতাসে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল।

-- আসবে বলেছিল তো। প্রিতমের ছোট্ট উত্তর। কিন্তু সামান্য উদাসীন রুষিত মাত্রা কান এড়াল না কারো।

-- আসবে না।                                                                                                                                      সমরদার না আসায় নিঃসংশয় নিশ্চিত হবার সিলমোহর দিয়ে দিল উজ্জ্বল। তার কথা মেনে না নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। কোনো অনুষ্ঠানে এই সময়ে মোটামুটি যারা আসার এসেই যায়। সমরদাও এলে এসেই যেত। তাছাড়া উজ্জ্বল সিনিয়র লেখক সমরদার ন্যাওটা। সবসময় সঙ্গে থাকে। হয়তো এলে তার সঙ্গেই আসতো। বা বুদ্ধের। সেও ন্যাওটা।   

-- অথচ কফিহাউসে তোমাদের প্রত্যেক শনিবারের আড্ডার সাথী। এবং সারথী।

কেউ যেন লঙ্কাগুঁড়ো ছেটানোর মতো বলল।

-- আসলে নেমতন্ন রক্ষা করতে করতে হাঁপিয়ে গেছে সমরদা।                                                                   সমরদাঘনিষ্ঠ বুদ্ধ, ফুট কাটল।

-- এই বছরে বোধহয় গোটা দশ-বারো বইমেলা উদ্বোধন করতে হয়েছে সমরদাকে। ফেসবুক দেখে দেখে যা বুঝেছি। বলল অপরিচিত একজন। 

-- সাহিত্য একাডেমি পাওয়া, রবীন্দ্র পুরস্কার পাওয়া লেখক। কতদিক আর সামলাবে।

   

আসলে সবাই চায় তার বাড়ির অকেশনে হোমরাচোমড়া আসুক। কাবুলের মনে পড়ে তাদের মেয়ের বিয়েতে লতায়পাতায় এক আত্মীয় সাংসদকে হাজির করানোর জন্য তাঁর স্ত্রীর উঠেপড়ে লাগা। ভিন্ন রাজনীতি আর শ্বশুরবাড়ি তরফের হওয়ার কারণে কাবুলের বিরুদ্ধতা ছিল। তবু রিশেপশনে এম্পিকে ঘিরে নিমন্ত্রিতদের কৌতূহল আর উৎসাহ তাকেও যে সেই সময় বেশ কিছুটা শ্লাঘা জুগিয়েছিল মানতে বাধ্য সে। বা ইন্ডোর স্টেডিয়ামে সহস্র কণ্ঠে গান গাওয়ানো তার মিউজিক ডিরেক্টর বন্ধু। গণ্ডারের মতো নাসিকা যুক্ত এক আঁতেল কবি তো কাবুলের সেই সঙ্গীত পরিচালক বন্ধু সম্পর্কে কিছু না জেনেও শুধুমাত্র সেলিব্রেটি বলেই তার সঙ্গে স্ত্রী-পুত্র নিয়ে ছবি তুলতে দাঁড়িয়ে গেল।

 

বাটি গেলাস শূন্য আর পূর্ণ হয়েই চলেছে। একেবারে মস্ত্‌ আবহাওয়া। এরকম কোজি অ্যাম্বিয়েন্স  পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।

কাবুল মদঘরের বাইরে বেরল একবার । না ঠিক আছে। পা টলছে না। জিভ মোটা হয়ে যায়নি। গা গুলিয়ে উঠবার সম্ভাবনা নেই একেবারেই। তখনই সস্ত্রীক সপুত্র দেখতে পেল অমিতাভকে।

একসময় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সাহিত্য অ্যাকাডেমির সাময়িক কর্তা ছিলেন। কেন্দ্রের ব্যাপার। পারিশ্রমিক দিয়ে সেক্রেটারি রাখার অনুমোদন এবং অধিকার বর্তায়। খ্যাতিমান লেখকটির সেক্রেটারি হওয়া কম ভাগ্যের ব্যাপার ছিল না। যোগ্যতারও। তো এই অমিতাভই ছিল সেই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সেক্রেটারি। কাবুল একদা তার সেক্রেটারিশিপের অনেক গল্প শুনেছে তার মুখ থেকে। বর্তমানে পরিশ্রমী সাহিত্যকর্মী। বড় সংবাদপত্রের নিয়মিত লেখক। নিজস্ব পত্রিকা আর পাবলিকেশন আছে। পর পর বই ছাপিয়েই যায়।

 

বৌভাতের আমন্ত্রিত অতিথি সমাগম পর্যবেক্ষণে কিছুটা সময় অতিবাহিত করে অ্যান্টিচেম্বারে ফেরে কাবুল। বুঝতে পারে পানসি সেখানে বেলঘরিয়া অতিক্রম করে গেছে। কথাবার্তার ঢেউ উথালপাথাল। এই অবস্থাতেই তো দুর্বলতর কথাগুলি বেরিয়ে আসে। লেখকদের দুর্বলতা লেখা। তাই লেখালেখির কথা, লেখকদের কথা, ছোটবড় পত্রিকার কথা, সম্পাদকদের অজ্ঞতা জ্ঞানতার কথা, পণ্যসাহিত্য এবং সরকারি প্রাতিষ্ঠানিকতার কথা। সমষ্টিগত প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার কথার সঙ্গে ব্যষ্টি বিরোধিতার মতো কথাও। যখন কাবুল বলে বসে,

-- সমরদার লেখালেখি তেমন পড়া হয়নি। শক্তিশালী লেখক। তাঁর অজস্র গল্প উপন্যাস। কবে, কখন আর পড়ব? 

-- হ্যাঁ ওই দুটো, যে দুটোতে আকাদেমি আর রবীন্দ্র, ঠিক আছে। বাকি সব ঝাঁটের লেখা। বালের লেখা।

হিন্দি থেকে বাংলায় অনুবাদ করায়, একই তুলনা দু-বার বলে, যেন বলে বসে প্রিতম।                                         তার ছেলের বৌভাতে সমরদা আসবো বলেও এলো না। সেই রাগ বিস্ফোরণে প্রতিফলিত হল, বুঝতে অসুবিধা নেই। কিন্তু তাই বলে হপ্তার পর হপ্তা গায়ে গা লাগিয়ে আড্ডা দেওয়া, প্রিতমদের একেবারে নিজস্ব বৃত্তের, যথেষ্ট সম্মানীয় সমরদা সম্পর্কে এই অপভাষা প্রয়োগে যথেষ্ট হতচকিত হয়ে পড়ে কাবুল। কিন্তু আশ্চর্য হয়ে যায় প্রিতমের থেকেও সমরদার যারা অনেক বেশি ক্লোজ সেই উজ্জ্বল আর বুদ্ধের মুখে সমর্থনের মিটিমিটি হাসি দেখে।

কাবুলের মধ্যে কেমন যেন ভালোলাগা মন্দলাগার মিশ্র প্রতিক্রিয়া হয় এরপর। জুলিয়াস সিজারের প্রতি ব্রুটাসের মতো বিশ্বাসঘাতকতা। উপরে ভক্ত ভিতরে বিরক্ত অ্যাটিটিউড। অন্ধ নয়, লেজুড় নয়, মতামতে স্পষ্টবাদী, এরকম লেখকদের সঙ্গ সন্ধানেই তো কাবুলের বুড়িয়ে যাওয়া।                                 তাহলে এরা ঠিকঠাক আছে। পুরস্কারের কাছে, প্রতিষ্ঠান, খ্যাতর কাছে অবনত হয়নি।

 

পানের পর ভোজন হয়েও পানভোজন সাঙ্গ হয় না। আবার পানে যেতে হয়। পানের কাউন্টারে পান দেওয়া ছোকরা ইলিক ভিলিক করে ভীড় জমিয়ে রেখেছে। লেখক দল থেকে যেন প্রতিনিধি, উজ্জ্বল সেখানে পানাকাঙ্ক্ষী, নির্দেশ দিল,

-- মিঠা পাত্তি। ডাবল পাত্তা দেবে। সুতা সুপারি, সুতা বাদাম। বেগর কত্থা, হাল্কা চুনা। ইলাইচ, লবঙ্গ, জাফরান, মেন্থল, আউর যো যো হ্যায় দেবে।

-- বাপরে বাপরে থোড়া রুক যাইয়ে। অর্ডারকো সামহালনে দিজিয়ে। আগুন-পান খাবেন কি?

-- আগুন-পান? সেটা আবার কী?

-- জানেন না? মশহুর আছে। পানে আগুন জ্বলবে। আগুন লিয়ে পান আপনার মুয়ে ঘুষবে, ফির ভি আপনার মু জ্বলবে না। 

-- না-না, বার্স্ট করবে।                                                                                                                             -- মতলব?

-- আরে পেটটা ভর্তি হয়ে আছে পেট্রলে। সেখানে আবার আগুন পড়লে পুরোপুরি বার্স্ট। 

 

ছোকরা পানওয়ালা পান তৈরি করতে দীর্ঘ সময় তো নিলই। নিয়েও আবার শুরু করল ভ্যানতারা। সে উজ্জ্বলের মুখের কাছে পানের একটা ঢাউস খিলি বাড়িয়ে ধরতেই উজ্জ্বল হাঁ করেছে। সে হাঁয়ের মধ্যে পান না ঢুকিয়ে হস্তধৃত পানের খিলি পিছিয়ে আনল। উজ্জ্বল হাঁ বন্ধ করল। পান-ছোকরা আবার পান নিয়ে গেল উজ্জ্বলের মুখের কাছে। উজ্জ্বল আবার হাঁ করল। ছোকরা হাঁয়ের মধ্যে পান না ঢুকিয়ে হাঁয়ের সামনে হাত থামিয়ে রাখল। তারপর মন্দিরের আরতির মতো পান সমেত ছুঁচালো হাতের মুঠি উজ্জ্বলের মুখের চারপাশে ঘোরাতে লাগল। আরতি করার মতোই নৃত্যশৈলির মুদ্রায়। আচ্ছা বেয়াদব তো! কাবুল দপ করে রেগে উঠেই, উজ্জ্বল রাগলো না দেখে জল হয়ে গেল। আচ্ছা! এই হরকত তাহলে এখানেও আমদানি হয়ে গেছে। কিছুদিন আগে এক বন্ধুর দুবাই ভ্রমণ ফলো করছিল ফেসবুকে। খলিফারাই ব্রিজ খলিফা পর্যন্ত গিয়ে উঠতে পারে। তো সপরিবার বন্ধুর দল ব্রিজ খলিফার পাদদেশের এক আইসক্রিম কাউন্টারে দাঁড়িয়ে। কনিষ্ঠাটি নাতনি। তাকেও এমনি হাঁ-মুখ দণ্ডায়মান রেখে, আরতি নৃত্যের ভঙ্গিতে হাত ঘোরাচ্ছিল সেখানকার আইসক্রিম-ছোকরা। তো এই হাঁ-মুখের সামনে টোপ নাচানো সংস্কৃতি আমদানির কথা উজ্জ্বলও নিশ্চয়ই জানে। তা নাহলে ওরকম মুখ হাঁ করে দাঁড়িয়ে থাকা সে নিশ্চয়ই বরদাস্ত করত না। তাহলে এটাই এখন ট্রেণ্ড।

কাবুল পাশে দাঁড়িয়ে ভাবাভাবি করে বোঝে, ব্যাপারটা যথেষ্ট অ্যাকসেপ্টেড। কারণ প্রিতম বুদ্ধ শান্তনু এরা প্রত্যেকেই ছবি তুলছে নয় ভিডিও করছে। আর মুখ হাঁ করে যেন পান নয়, টোপ গেলার জন্য দাঁড়িয়ে আছে উজ্জ্বল। 

একজন লেখকের জন্য কী কী টোপ থাকে? কত প্রকার? প্রথমের দিকে ছোট পত্রিকায় সুযোগ, ক্রমশ বড় পত্রিকায় লেখা ছাপা, ছোট পাব্লিকেশন থেকে গাঁটের পয়সা খরচ না করে বই ছাপা। সাহিত্য সভার আহ্বান ছোট মাঝারি মঞ্চ, উত্তরীয়, মেমেন্টো, ফুলের তোড়া। বড় পাবলিকেশন হাউস, বিজ্ঞাপন সুযোগ, রাজ্যস্তর থেকে কেন্দ্রীয় স্তরের সরকারি পুরস্কার। বড় সাহিত্যসভার আহ্বান। থাকে বিভিন্ন বেসরকারিও। থাকে নিদেন গ্রামগঞ্জ থেকে আহ্বান। লাইব্রেরি উদ্বোধন, বইমেলার ফিতেকাটা। নাম যশ, এবং তার ক্রমবৃদ্ধি। শুধু উজ্জ্বল একা নয় তার বদলি হিসেবে দাঁড়াতে থাকে নিমন্ত্রিত অনিমন্ত্রিত লেখকদের অনেকেই। একের পর এক প্রিতম, শান্তনু, সুকুমার, বুদ্ধ, কাবুল নিজে, এমনকি অ্যাকাডেমি প্রাপ্ত সমরদাও। সবাই হাঁ করে দাঁড়িয়ে থাকে। আর ওই নাম, খ্যাতি, উত্তরীয়, মেমেন্টো, পুরস্কার, ফিতে কাটার কাঁচি, ফুলের মালা, তোড়া, সভাপতির চেয়ার, টোপের মতো ঘুরতে থাকে, অদৃশ্য কারো, বলা যাক সিস্টেমেরই হাতের ডগায় ধৃত, সবার স্বতন্ত্র হাঁ-মুখের পাশে। কাবুল এমতো ইমেজারি সমূহের মাঝে এও বুঝতে পারে আরেকটা গল্পের জন্ম হচ্ছে মাত্র। 

Responsive Ad Unit (e.g., 728x90 or 320x100)

0 মন্তব্য

আপনার মন্তব্য জানান

সর্বাধিক পছন্দের লেখা

সর্বাধিক পঠিত লেখা