সুধাময়ের গলায় একটা খুশির ছোঁয়া। একটু অবাক হলো রেখা। বাজার সেরে ফিরেছেন সুধাময় । ব্যাগটা হাত থেকে নিয়ে আনাজপাতি সরিয়ে এক সঙ্গে দু প্যাকেট দুধ দেখে রেখার মনটাও খুশিতে ভরে গেল। খুব যত্ন করে কাঁসার জামবাটিতে ঢালল। সে মনে মনে হিসেব করল প্রায় দু’মাস পরে এ বাড়িতে দু প্যাকেট দুধ এলো। যা দাম! সুধাময়ের একার রোজগারে বিশেষ বিশেষ দিন ছাড়া দুধ কেনা প্রায় হয়ই না। রেখা বুঝল আজ একটু পায়েস খাওয়ার ইচ্ছে হয়েছে তাঁর স্বামীর। তাই মনে করে একটা ছোট ব্যাগে তিনি গুড়ের বাতাসা মিছরি এইসবও গুছিয়ে এনেছেন।
রেখা দুধ জ্বাল দিতে দিতে ভাবে পায়েস রাঁধতেন তাঁর মা। তাদের বাড়ি ছাড়িয়ে পাশে নিতাইকাকার বাড়ি অবধি পৌঁছে যেত সেই সুঘ্রাণ। দুধ ঘন হয়ে উঠলে ধুয়ে শুকনো করে রাখা চিনিগুড়া চালে ঘী মাখিয়ে নিতেন, তারপর তা সুন্দর করে ঢেলে দিতেন ফুটন্ত দুধে । মাঝে মাঝে নাড়তে থাকতেন যাতে হাড়ির তলায় লেগে না যায়। তাঁর মা বলতেন, জানস মাংস আর পায়েস পোড়া লাগলে মোটেও খাওন যায় না। খুব সাবধানে রাঁধতে হয়। সামনে থিকা মোটেও নড়নের উপায় নাই। চাল সুসিদ্ধ হলে দিতেন মিছরি পাটালি গুড় কিংবা গুড়ের বাতাসা। গন্ধ পেয়ে নিতাইকাকা হাঁক পারতেন বলতেন , ও বৌঠান আইজ বুঝি পরমান্ন হইতাসে। মা হেসে বলতেন হ ঠাকুরপো , রেখারে দিয়া পাঠাইতাসি। প্রায় দুই কী তিন জামবাটি ভর্তি পায়েস ! মা প্রতিবেশীদের বাড়িতে দিতেন আনন্দ করে। আসলে তাঁদের পোষা গাই বুধি তখন প্রায় কেজি চারেক দুধ দিত! কী সব দিন ছিল তখন!
সে সব ছেড়ে চলে এসে তাঁর মা বেলারাণী একটুও ভালো ছিলেন না। রেখার বয়স তখন সাত কী আট। তাঁরা এদেশে পাড়ি দিলেন। টুকরো হয়ে যাওয়া দেশে তাঁদের প্রিয় ভূখণ্ড ছেড়ে তাঁদের যে কেন চলে আসতে হলো , তা বেলারাণী তেমন বুঝলেন না। সব সময়ই গল্প করতেন সে গ্রামের। কত কী যে বলতেন! আসলে গোবরনিকানো উঠোন, একটা পুকুর, একটা কী দুটো প্রিয় পোষ্য, তুলসীগাছ আমগাছ এসবের একটা মায়া আছে। এ মায়া ফেলে আসা যে কী কঠিন! তাঁদের বাড়ির থেকে একটু এগিয়ে একটা বিল ছিল। ওই বিলে ভাদ্রমাসে কত শাপলা ফুটতো। কত রকমভাবে এই শাপলা রাঁধতেন তাঁর মা। তবে রেখার সবচেয়ে পছন্দ ছিল শাপলার ভেলার বড়া।
এদেশে রেখার মা আসার সময় সঙ্গে করে বেশ কয়েকটা জিনিস এনেছিলেন। বেশ কিছু কাঁসার বাসন ছিল তাঁর। ছিল খান দশেক জামবাটি। আর বেশ কয়েকটা কানা উঁচু থালা।
শীতের সকালে একটা কানা উঁচু কাঁসার থালায় গরম গরম ফ্যানাভাত আর আলুসেদ্ধ মাখা খেতে খেতে রেখা শুনত, এই থালা নাকি তিনি চটের বস্তায় বেঁধে নিয়ে এসেছেন দেশ ছেড়ে আসার সময়। নিয়ে এসেছেন বসে থাকা এই পিঁড়িটার মতো আরো চারটে পিঁড়ি। কত কী বলতেন! এমন সুন্দর শীতের সকালের বর্ণনা তিনি দিতেন! বলতেন, সূর্যোদয়ের আগেই মোরগের ডাকে ঘুম ভাঙত তাঁর। গ্রামের মধ্যে যে কটি মুসলমান পরিবার ছিল তাঁরা মুরগি পুষতেন। সে সময় হিন্দু বাড়িতে মুরগির প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। দুয়ার খুলে বের হলেই চোখে পড়ত ঘন কুয়াশা। দেখা যেত কোন না কোন গাছি কাঁধে করে বয়ে নিয়ে যাচ্ছেন খেজুরের রস। উঠোনের দুই ধারে হলুদ গাঁদাফুল । একসারি পাঁপড়ি সাজানো লাল রঙের পেতিগাঁদা ফুলও ফুঁটে থাকত সারা উঠোন জুড়ে। রেখার পিসি সুলেখা গোবর ছড়া দিয়ে উঠোন ঝাঁট দিতেন। সূর্যদেব হেসে উঠলেই উঠোন গোয়ালঘর গাছ ফুল সব ঝকঝক করত। এসব রেখা দেখেছে। কিন্তু তাঁর মায়ের দেখার চোখ আর মন দুই ছিল আলাদা। আসলে রেখা খুব ছোটবেলায় দেশ ছেড়ে এসেছে। তাঁর মনেও বেশ কিছু স্মৃতি। বিশেষ করে নৌকার দুলুনি সে আজও অনুভব করে আর ঠাকুর্দার কীর্তন গানের সুর তাঁর কানে আজও বাজে।
সুধাময়ের সঙ্গে যখন রেখার বিয়ে ঠিক হলো, তখন রেখার বাবা তেমন একটা রোজকার ছিল না। দেশে তাঁর কাপড়ের ব্যবসা ছিল। এদেশে তাঁর ব্যবসা ততটা জমে নি। তবে রেখার দাদা রবি বি এ পাশ করে একটা ইস্কুলে সদ্য চাকরি পেয়েছে। বোনের বিয়ের দেখাশোনা থেকে খরচ এর দায়িত্ব সে নিজেই কাঁধে তুলে নিয়েছে। কিন্তু নতুন চাকরি আর তাঁর মাইনে তেমন আহামরি কিছু নয়। রেখার মা তাঁর নিজের সঞ্চিত বাসনপত্র থেকে দানের বাসন কটা গুছিয়ে দিলেন। দিলেন দুটো জামবাটি।
রেখা পায়েস জামবাটিতে ঢালতে ঢালতে ভাবে এই বাটিগুলো মায়ের বড্ড প্রিয় ছিল। কত বিপদ থেকে যে তাঁর মাকে রক্ষা করেছে এই জিনিসগুলো! তা রেখার মতো কেউ জানে না। সেবার তাঁর দাদার পরীক্ষার ফিস জমা দিতে হবে। বাবা শুকনো মুখে রেখার মাকে বললেন, কিছু একটা করো বেলা। আমার তো একদম হাত খালি! রেখার মা একটা জামবাটি আর একটা বোগীথালা হাতে নিয়ে পরেশ কাঁসারির বাড়ি গেল। সেই বাসন বিক্রির টাকায় তাঁর দাদা রবি সেবার পরীক্ষায় বসল। তারপর সেই একবার রেখার ধুম জ্বর এলো। পাড়ার হোমিওপ্যাথ সুধীর ডাক্তারের ওষুধে সে জ্বর কমল না। মেজমামা দেখতে এসে মায়ের হাতে কিছু টাকা দিয়ে বলে গেলেন তাঁকে যেন সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁর নাকি মনে হচ্ছে এ টাইফয়েড। হলোও তাই। রক্ত পরীক্ষা ওষুধ পথ্য সব সামলে দিল আরও খানদুই জামবাটি।
রেখা জামবাটিতে পায়েস ঢালতে ঢালতে ভাবল এই বাটি দিয়ে কত সম্মান রক্ষা করেছেন তাঁর মা তাঁদের। রেখার ছেলের অন্নপ্রাশনে রেখার বৌদি সোনার আংটি কিনে মায়ের হাতে দিয়েছিলেন। সঙ্গে কাঁসার থালা বাটি গ্লাস। সেবার কিন্তু মা প্রথম নাতির মুখ দেখলেন একখানা জামবাটি আর একখানা দুধ খাওয়ানোর জন্য ঝিনুক দিয়ে। রেখা আড়ালে মাকে ডেকে খুব বকেছিল। বলেছিল, মা আমি তো জানি এই বাটিগুলো যে তোমার কত প্রিয়! এতে আমাদের দেশগাঁয়ের গন্ধ স্মৃতি লেগে আছে! মা হেসে বলেছিলেন, প্রিয়জন যেমন মান প্রাণ বাঁচাতে পাশে থাকে মেয়েদের সঞ্চিত এই বাসন গয়না ঠিক সে ভাবেই দরকারে পাশে থাকে। বড্ড মায়া রে মা। তবে এবার আমি ধীরে ধীরে সব মায়া কাটাতে চেষ্টা করছি। রেখা মায়ের মুখে হাত দিয়ে চাপা দিল। বললো না মা এসব কথা বলো না। মন খারাপ লাগে।
এই তো গত বছর মা চলে গেলেন। মায়া কী পুরোপুরি ত্যাগ করা যায় নাকি গচ্ছিত থেকে যায় সন্তানদের মধ্যে? রেখা দুয়ারে গিয়ে দাঁড়ায়। দেখে সামনে বিস্তীর্ণ মাঠ! রেখার নাকে পায়েসের গন্ধ ! রেখা যেন স্পষ্ট দেখতে পায় তাঁর মা জামবাটি ভর্তি পায়েস নিয়ে একটা সবুজে সবুজ ধানক্ষেতের আল পথ ধরে হেঁটে চলেছেন। হাওয়ায় মাঠে তাঁতিভাইদের শুকোতে দেওয়া লাল শালু উড়ছে। আর সেই হাওয়ায় কী ঘোমটা খসে গেল তাঁর মায়ের! মা চলেছেন ওই পারে দয়া বৈষ্টমীর বাড়ি পায়েস দিতে। রেখাও আজকাল এসব দেখতে পায়। রেখাও মায়ায় জড়িয়ে থাকে! রেখা ধীরে ধীরে ঘরে এসে এক ঢোক জল খায়। তারপর বিছানায় কাৎ হয়ে শুয়ে পড়ে। চোখের জলে তাঁর বুক ভেসে যায়।

0 মন্তব্য
আপনার মন্তব্য জানান