পিতৃতান্ত্রিক সমাজের নারীরা চিরকালই ভোগ্যপণ্য হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। পুরুষ লেখকদের দ্বারা রচিত শাস্ত্রে তাই আমরা বারবার উল্লেখ দেখতে পাই "নারী নরকের দ্বার" কিংবা "পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভার্যা" যার অর্থ পুত্রসন্তান জন্ম দেওয়াই নারীর কাজ। অথচ বৈদিক যুগের আদি পর্বে কিন্তু বলা হত ‘যত্র নার্যস্তু পয়জ্যন্তে রমন্তে তত্র দেবতাঃ।/ যত্রৈতাস্তুন পূজ্যন্তে সর্বাস্তত্রফলাঃ ক্রিয়া।’ অর্থাৎ যেখানে নারী পূজিতা, সেখানে দেবতাও খুশি হন, যেখানে তাঁদের পূজা নেই, সেখানে সকল ধর্মকর্মই নিস্ফল। সেসময় নারীদের যেমন নিজ স্বামী পছন্দ করার অধিকার ছিল ঠিক তেমনি যাগযজ্ঞ , পুজো অর্চনা, বেদ অধ্যায়ন, এমনকি যুদ্ধবিদ্যায়ও অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল। কিন্তু আনুমানিক খ্রীস্ট পূর্ব ৫০০ বছর আগে থেকে নারীর সমাজে অবস্থানের অবনতি শুরু হয়। শিক্ষা ও জ্ঞানার্জনের সুযোগ থাকে বঞ্চিত করা হয়। সেইসঙ্গে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমস্ত ক্ষেত্রেই তার অধিকার খর্ব করা হয়। তাকে একজন মানুষ হিসেবে নয় বরং শুধু পুরুষের জৈবিক ও সাংসারিক চাহিদার উপায় হিসাবে ব্যবহার করা হতে থাকে। আর সেই চাহিদা পূরণ না হলেই তার অবশ্যম্ভাবী ফল হয় নারীর উপর লাঞ্ছনা ও নির্যাতন। সে লাঞ্ছনা কখনো শুধু বাক্যের মাধ্যমে, কখনো শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মাধ্যমে আবার কখনো তার চরম সীমা পার হয়ে ধর্ষণ ও হত্যার মতো বিভৎস গা শিউরে ওঠা নিষ্ঠুরতার মাধ্যমে।পুরুষ শাসিত সমাজে তাই নারী নির্যাতন ও লাঞ্ছনার উদাহরণ পরবর্তী বৈদিক যুগ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক কালেও সমানভাবে পরিলক্ষিত হয়।
কারোর উপর হুকুম চালানো, নির্যাতন, অত্যাচার, শোষণ ইত্যাদি করার সবচেয়ে সহজ উপায় হল তাকে জ্ঞানার্জনে বাধা দেওয়া ও অর্থনৈতিক ভাবে স্বাবলম্বী না হতে দেওয়া। ঠিক সেই সহজতম উপায়ই অবলম্বন করা হয়েছিল প্রাচীনকালেও। পরবর্তী বৈদিক যুগ থেকেই নারীদের শিক্ষা, বেদ অধ্যায়ন, শাস্ত্র আলোচনা ও পৈতৃক ও স্বামীর সম্পত্তি থেকে অধিকার হরণ করা হয়। যারা এই সমাজ ব্যবস্থার বিরোধীতা করেছে পুরুষ শাসিত সমাজ তাদেরই কন্ঠরোধ করার চেষ্টা করেছে ও নানাবিধ শাস্তি দিয়েছে। সেই বিবিধ প্রকার নির্যাতন ও লাঞ্ছনার মধ্যে প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় নারীর বাকস্বাধীনতার বিলোপ ও কন্ঠরোধের চেষ্টা। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়,চন্দ্রকেতুগড়ের খনা- মিহিরের স্তুপ থেকে প্রাপ্ত নথি ও ধ্বংসাবশেষ থেকে জানা যায় খনা নাম্নী এক পন্ডিতের কথা যার পান্ডিত্য ও জ্ঞানের আলোয় তৎকালীন পুরুষ সমাজ ভয় পেয়ে গিয়েছিল। তাঁর বচন বা খনার বচন এত প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল যে কথিত আছে তাঁর পরিচিতি ও প্রসিদ্ধি হ্রাস করতে তাঁর জিভ কেটে ফেলা হয়। নারীশিক্ষাকে পুরুষতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা চিরকালই ভয় পেয়েছে কারণ সমাজের প্রবাদবাক্যেই উল্লেখ রয়েছে যে “যত বেশি জানবে, তত কম মানবে”। প্রাচীনকাল থেকে তাই বর্তমান সময়েও অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষিত নারী সমাজের চোখে ভয়ঙ্কর। মধ্যযুগে শিক্ষিত নারীকে বলা হত ডাকিনী বা ডাইনি যে কিনা যার দিকেই তাকাবে সে মারা যাবে। আবার মধ্যযুগ থেকে প্রায় বিশ শতকের প্রথম দিক পর্যন্ত প্রচলিত কথা ছিলো নারী যদি পড়াশুনা শেখে, তবে তার স্বামী মারা যাবে। মোটের উপর নারীর শিক্ষা, জ্ঞানার্জন ও বাকস্বাধীনতার পথে বাধা সৃষ্টি করে নারীর উপর নিপীড়ন, শোষণ, অত্যাচার, লাঞ্ছনার পথ প্রশস্ত করা হয়েছে সেকালেও একালেও।
মনু স্মৃতি অনুযায়ী, নারী শৈশবে পিতা, যৌবনে স্বামী, বার্ধক্যে পুত্রের অভিভাবকত্বে থাকবে অর্থাৎ একজন মহিলা স্বয়ংশাসিত থাকার উপযুক্ত নয়। নারীর প্রতিটি প্রতিশব্দেও সেই পরনির্ভরশীলতার প্রতিধ্বনি শোনা যায়। যেমন রমণী মানে যে নারী রমণের উপযুক্ত; মহিলা মানে যে মহলে বা অন্তঃপুরে থাকে; কামিনী মানে যে কামনা বা কাম পূরণ করে; অবলা মানে অসহায় ও দূর্বল ইত্যাদি। সামাজিক, মানসিক, অর্থনেতিক, শারীরিক, রাজনৈতিক, বৌদ্ধিক সমস্ত ক্ষেত্রেই নারীকে অধঃস্তনে রাখার প্রক্রিয়া শুধু সমাজের রীতি নীতিতে নয়; মেয়েদের শৈশব থেকেই মাথায় এমনভাবে সুচতুরভাবে চক্রান্ত করে ছাপ ফেলা হয়ে চলেছে যে তা নারীদের জিনগত বিশ্বাস ও সংস্কারে পরিণত হয়েছে। এই অবদমনের ফলে পুরুষ তার 'male ego' ও 'male superiority complex' এ এবং নারী 'female inferiority complex' এ ভোগে যার কারণে যখনই মেয়েরা কোনকিছুতে পুরুষকে হারিয়ে এগিয়ে যায় তখনই পুরুষের অনেকাংশ শারীরিক, মানসিক নির্যাতন এমনকি ধর্ষণ, হত্যার পথ অবলম্বন করেছে। মধ্যযুগে তাই সুলতানী শাসনব্যবস্থায় সুলতান হিসেবে যখন রাজকন্যা রাজিয়া দিল্লীর মসনদে বসে তখন মন্ত্রী সভার প্রায় সকলেই নারীর শাসনে শাসিত হতে রাজী নয় বলে একযোগে রাজিয়াকে পরাজিত ও হত্যা করে। এর পরবর্তী যুগেও নারীর সর্বেসর্বা হওয়াকে পুরুষ সমাজ কখনোই ভালো চোখে দেখেনি।
প্রাচীনকাল থেকেই নারীর অধিকার খর্ব ও দমন করার উদ্দেশ্যে নানারকম প্রথার প্রচলন ছিল যেগুলোর প্রত্যেকটিই নারীর জন্য ক্ষতিকর কিন্তু পুরুষের জন্য সুবিধাজনক। যেমন স্বামীর পৈতৃক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার জন্য সতীদাহ প্রথা; পুরুষের কাম নিবৃত্তি ও মনোরঞ্জনের জন্য বহুবিবাহ, উপপত্নী ও বাইজি প্রথা; নারীর বিধবা বিবাহে নিষেধাজ্ঞা; সতীত্ব রক্ষার স্বার্থে জওহর প্রথা; দেবদাসী প্রথা, পর্দা প্রথা, শিশুকন্যা হত্যা, লিঙ্গবৈষম্য, তিন তালাক প্রথা ইত্যাদি। আধুনিক যুগের প্রথমার্ধে ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজা রামমোহন রায় প্রমুখ সমাজ সংস্কারকের ঐকান্তিক চেষ্টায় এই বর্বর প্রথা গুলির প্রায় সবকটিই বর্তমানে বিলুপ্ত হলেও আজও ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের কারণ হিসেবে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীর পোশাক, আব্রু ও পুরুষসঙ্গীহীন একা চলা ফেরা, থাকা কিংবা কর্মরত থাকার স্বাধীনতাকেই দোষী সাব্যস্ত করে।
প্রাচীনকাল থেকেই নারীকে একজন মানুষ হিসেবে না দেখে পুরুষ তাকে নিজের সম্পত্তি গণ্য করে এসেছে। নারীকে সম্পদ না ভেবে ভোগ্যপণ্য বা উপভোগের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করেছে। মহাভারতেও তার ছায়া দেখি যখন পঞ্চপান্ডব অন্যান্য জড়বস্তুর মতোই স্ত্রী দ্রৌপদীকে জুয়ার বাজি রাখে এবং ভরা সভায় সমস্ত মন্ত্রী পরিষদের মাঝখানে দুর্যোধন তার সন্মান ও শ্লীলতাহানি করে। সে সময়ে পাঁচ বীর যোদ্ধা স্বামী ও জ্ঞাণী গুণী আত্মীয়ের উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও দ্রৌপদীকে বাঁচাতে কেউ এগিয়ে আসে না। পণ্যবস্তুর মতো নারীর সেই সামাজিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থানের খুব বেশি পরিবর্তন দেখা যায় না বর্তমানেও। যার জলজ্যান্ত উদাহরণ পণপ্রথার মতো সামাজিক ব্যাধি যেখানে পণের পরিমানই নারীর স্ত্রী হওয়ার তুল্যমূল্য এবং নারীর সারা জীবনের ভরণ পোষণ ও আশ্রয়ের বিনিময়মূল্য। এখনও অনেকক্ষেত্রেই শিক্ষায় দীক্ষায় শিক্ষিত পুরুষ কার্যক্ষেত্রে অসফল হয়ে দিনশেষে নিজেকে স্ত্রীর 'মালিক' ভেবে নির্যাতন করে নিজের অবসাদ ও ব্যর্থতা কাটায় কিংবা স্ত্রী প্রতিবাদী বা নারী স্বাধীনতায় একটু বেশি বিশ্বাসী হলে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন ছাড়াও ডিভোর্স কপালে জোটে। লজ্জার বিষয় হলেও আজকের দিনে দাঁড়িয়েও তাই দেখা যায় একাংশ পুরুষের চোখে নারী এখনও শুধুই ভোগ্যপণ্য বা প্রভূত পরিমাণ পণের উপায় মাত্র।
নারী লাঞ্ছনা, নিপীড়ন ও অবমাননার সর্বশেষ প্রধান এবং সবচেয়ে নিকৃষ্টতম ও নির্মম ঘটনা হল ধর্ষণ ও যৌণ নির্যাতন। বর্তমান সময়ে ঘটে যাওয়া একের পর এক ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা নারী নির্যাতনের আগেকার সমস্ত প্রথা ও রীতিনীতিকে হারিয়ে দিয়েছে।থমসন রয়টার্সের রিপোর্ট অনুযায়ী, মহিলাদের জন্য বিশ্বের চতুর্থ বিপজ্জনক দেশ হল ভারত। রিপোর্টটিতে জানা যায় যে ভারত জি-২০ দেশগুলির মধ্যে নারীদের জন্য সবচেয়ে অস্বাস্থ্যকর দেশ হিসেবেও উল্লিখিত। এছাড়াও গার্হস্থ্য হিংসা ও গার্হস্থ্য ধর্ষণের শিকার প্রায় অধিকাংশ মহিলা। বিভিন্ন রিপোর্ট অনুযায়ী জানা যায় "প্রাক্তন মহিলা ও শিশু কল্যাণ মন্ত্রী রেণুকা চৌধুরীর মতে ভারতে প্রায় ৭০% মহিলা গার্হস্থ্য হিংসার শিকার।জাতীয় অপরাধ নিবন্ধীকরণ বিভাগ (National Crime Records Bureau) কর্তৃক প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী প্রতি তিন মিনিট মহিলার বিরুদ্ধে একটি অপরাধের ঘটনা সংঘটিত হয়, প্রতি ২৯ মিনিটে একজন মহিলা ধর্ষিতা হন, প্রতি ৭৭ মিনিটে একজন মহিলার পণপ্রথার শিকার হয়ে মৃত্যু হয় এবং প্রতি নয় মিনিটে একজন মহিলা তার স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির লোকের নির্যাতনের শিকার হন।
অ্যাকশনএড ইউকে'র একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে ভারতে ৮০% নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে, তা সে অনাকাঙ্ক্ষিত মন্তব্য, অনঅভিপ্রেত শারীরিক স্পর্শ বা নির্যাতন যেভাবেই হোক না কেন। তাছাড়াও অল্পবয়সী ও বয়স্ক মহিলাদের পাচারের অনেক ঘটনাই প্রকাশিত হয়েছে। এই মহিলাদের হয় পতিতাবৃত্তি, গার্হস্থ্য কাজ বা শিশু শ্রমে বাধ্য করা হয়েছে।"(তথ্যসূত্র উইমেননিউজ২৪)
সুতরাং পরিশেষে দেখা যাচ্ছে নারী নির্যাতন, লাঞ্ছনা ও অবমাননার ঘটনা সেকেলেও যেমন ছিল তেমনি একালেও রয়েছে। শুধু তার বহিঃপ্রকাশ, ধরণ এবং পন্হার পরিবর্তন ঘটেছে। এর থেকে মুক্তির উপায় হল বিভিন্ন আইনের সাহায্য নিয়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও সংশোধন। কিন্তু এইসব সামাজিক ব্যাধিকে সমূলে উৎপাটন করতে হলে আইন নয় বরং সমাজ সচেতনতা, উপযুক্ত শিক্ষা ও জ্ঞানের প্রসার ও নারীর ক্ষমতায়নের প্রয়োজন। সর্বশেষে নারীর সমস্ত শৃঙ্খল মুক্তির উদ্দেশ্যে কবির ভাষায় বলা যায়-
"পতিতোদ্ধারিণী স্বর্গ-স্খলিতা
জাহ্নবী সম বেগে জাগো পদ-দলিতা,
মেঘে আনো বালা বজ্রের জ্বালা,
চির-বিজয়িনী জাগো জয়ন্তিকা।"

0 মন্তব্য
আপনার মন্তব্য জানান