মোবাইলটা বেজে উঠতেই তনুকা নিমেষে বুঝতে পারে কে ফোন করেছে। পরিচিত রিংটোন। আগে সাতকাজ ফেলে হুড়মুড়িয়ে ফোনের কাছে আসত। তখন বিয়ের বয়স ছয় মাসও পার হয়নি। এখন আর আসে না। ধীরেসুস্থে আসে। কখনওবা এমনও হয়েছে, অনেক সময় ধরে ফোন বাজতে বাজতে কেটে যায়। অচেনা নাম্বার। তারপর মোবাইল ফোনটা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করে। চেনা নাম্বার হলে রিং ব্যাক করে। অচেনা নাম্বার হলে একদম নয়। পাত্তা দেয় না। তার যুক্তি, দরকার পড়লে যে করেছে, সে আবার করবে। ঠিক করবে।
কিন্তু এই মুহূর্তে ফোনকলটা তার জানা। চেনা। একদম কাছের জন।
আবার বেজে ওঠে। বুঝতে পারে রাজদীপ। কি প্রশ্ন করবে তার জানা। সেই এক প্রশ্ন।
ফোনটা কেটে গেলে তাকে রিং ব্যাক করতেই হবে। না করলে উপায় নেই। আবার করবে। আবার...।
মোবাইলটা বাঁ কানের ওপর চেপে তনুকা নর্মাল গলায় বলে-বলো, কী বলবে...!
-অ্যাতোখন কি করছিলে?
-কাজ। স্পষ্ট উত্তর।
-কেউ কি এসেছিল?
-কে আবার আসবে শুনি? উলটে তনুকা প্রশ্ন করে।
-না মানে ভাবলাম...।
তনুকা হাসে। রাজদীপের এমন প্রশ্নে আপনা আপনি হাসি পেয়ে যায়। অনেকটা বোকা বোকা লাগে তাকে। আবারও অজান্তেই হেসে ওঠে খানিকটা। আসলে সে হাসিটাকে কনট্রোল করতে পারে না। সব কিছুতেই হাসি পায়। এটা তার মজ্জাগত স্বভাব। রোগ নয় মোটে। তখন সুন্দর মুখটা আরও সুন্দর হয়ে ওঠে। এমনও হয়েছে, রাস্তায় কেউ আচমকা হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলে 'আহা' 'উঁহু' তো দূরের কথা, তার বদলে ঝরনার মতো খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে। আশেপাশে রাজদীপের মতো অনেকেই অবাক হয়ে যায়। ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে থাকে তার সুন্দর মুখের দিকে।
এই যেমন এখন হাসছে। ভীষণভাবে হাসছে। বাঁ হাতের আঙুলগুলো ফুলদানিতে রাখা নকল ফুলের পাপড়ির ওপর নড়াচড়া করছে।
-তুমি হাসছো যে...!
-বাঃ রে! হাসব না কেন! তোমার তো একটাই মেজর প্রশ্ন। ‘কেউ কি এসেছিল?’ কে আসবে বলো তো শুনি, তুমি ছাড়া! এসব আমার জানা। সব জানা। বলেই আবারও তনুকা হাসে। হাসতে হাসতে ড্রেসিংটেবিলের কাছে চলে যায়। কথা বলতে বলতে ঘুরেফিরে নিজেকে দেখে ড্রেসিংটেবিলের আয়নায়। বার বার। বুক দেখে। কোমর দেখে। তারপর নাচের ভঙ্গিমায় পাছা দেখে। খুব গর্বিত লাগে তখন নিজেকে।
রাজদীপ জানতেও পারে না।
এইরকম ফোন রাজদীপের এই প্রথম নয়। ইদানিং করছে। ঘন ঘন। অফিসে যাওয়ার পর। কাজের ফাঁকে ফাঁকে। তখন রাজদীপের স্বরে অন্যরকম সুর শোনা যায়।
তনুকা অনেক কিছু ভাবতে থাকে তখন। ভাবনাটা রাজদীপকে কেন্দ্র করে। আগে ভালো লাগত। ভীষণ ভালো লাগত। এখন রীতিমতো বিরক্তি লাগে তনুকার। বিরক্তি লাগলেও কিছু করার নেই। সে যে তার স্বামী। একদম কাছের মানুষ। বড় আপনার।
মোবাইল ফোনটা কানে চেপে ধরতেই হবে। 'হ্যালো' 'হ্যালো' করতে হবে কয়েক মিনিট। অমনি ফোনের ও প্রান্তে বিরক্তিমাখা কণ্ঠস্বরের জিজ্ঞাস্য-কার সঙ্গে অ্যাতো কথা বলছিলে?
-কার সঙ্গে আবার!
-অনেকক্ষণ থেকে তোমায় ফোনে ট্রাই করছি...কিছুতেই পাচ্ছি না...।
-তাহলে টাওয়ারের প্রবলেম...।
-কই! অন্যের বেলায় তো হচ্ছে না!
-আমার কি ঘরের কাজ নেই?
-কি কাজ করছ? রাজদীপ উত্তেজিত ভাবে প্রশ্ন করে।
-তুমি কি একাই কাজ করো নাকি! ঘরের অনেক কাজ আছে মশাই...।
তারপরের ওই এক প্রশ্ন রাজদীপের-‘কেউ কি এসেছিল?’
-না আসেনি। এখনও পর্যন্ত তুমি ছাড়া কেউ আসেনি। বলতে বলতে তনুকা আবারও হেসে ওঠে অজান্তেই। আর হাসিটি ঝরনার মতো রাজদীপের কানের গর্তে প্রবেশ করে প্রবলভাবে মগজে ধাক্কা মারে।
ইদানিং যেন বেশি করে ‘ধাক্কা’ মারছে রাজদীপের মগজে। অফিসের কাজে ব্যাঘাত ঘটছে। সে বুঝতে পারছে সব কিছু। অথচ কাউকে কিছু বলতে পারছে না। কাকেই বা বলবে? তনুকাকে?
নেভার। বলা যাবে না।
আর তখনই তার চোখ অনায়াসে দুই থেকে চার, চার থেকে ছয়, ছয় থেকে আট...এমন গুণিতকে বাড়তে বাড়তে ছেলেবেলায় খেলা ছিটছিটে বাহারি রঙের কাচের বলের মতো একটা চেনের আকার নেয়। তারপর ইথার তরঙ্গে ভাসতে ভাসতে বেশ কিছু কিলোমিটার অতিক্রম করে নিজের বাড়ির চারপাশে এসে ছড়িয়ে পড়ে। গড়িয়ে পড়ে। কিছু বল বাড়ির দুপাশের চার ফুট প্যাসেজের ভিতর দিয়ে হনহন করে গড়িয়ে যায়।
তনুকা বুঝতেও পারে না।
২
দোতলা বাড়ি। রাজদীপের বাবা করেছিলেন। ওপর নিচ মিলিয়ে চারটি ঘর। দুটো ব্যালকনি। দক্ষিণমুখো। তাও অনেক অনেক বছরের পুরানো। রাজদীপের বিয়ের সময় এই পুরানো বাড়ির ভোল পালটে গেছিল এক পেইন্টস কোম্পানির দৌলতে। বিভিন্ন রঙের বাহারে বাড়ির বাহির আর ভিতর ঝাঁ চকচকে হয়ে উঠেছিল। কে বলবে এই বাড়িটি বহু বছরের পুরানো! অথচ বাড়ির পিছনের দিকটা কোনওমতে ধামাচাপা দেওয়ার মতো রং। রঙের প্রলেপ। সেই বাড়ির গোপন দরজার সামনে এসে দাঁড়ায় রাজদীপের একজোড়া চোখ।
দরজাটা পুরানো। ছিটকিনিতে জং পড়ে গেছে। তালাটারও একই অবস্থা। এখন খুলবে কিনা সন্দেহ আছে। তাছাড়া চাবিরগোছায় কোন চাবিটি এই তালার, মনে নেই রাজদীপের। তার ওপরও রং চাপিয়েছে।
না, সব ঠিক আছে। এদিকটায় সচরাচর কেউ আসে না। অ্যাতো বছর বয়স হল রাজদীপের, কোনও দিনই আসেনি সে। এখানে আসার দরকার পড়ে না। এখন পড়েছে। পড়েছে বলেই সে অবাক হয়ে দেখে। আরও একজোড়া চোখ গড়িয়ে আসে কোন ফাঁকে। তার মনে হয়, প্রত্যেকের বাড়ির পিছন দিকটা বুঝি এমনই। বড়ই করুণ। অবহেলিত। তার বাড়ির মতো।
রাজদীপ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। কেন্দ্রীয় সরকারের এক মস্ত বড় অফিসার। পদের ভার আছে। সবাই তাকে সম্মান করে। স্যালুট করে। সমঝে চলে। সব সময় তার কপালে চিন্তার দাগ এমুড়ো থেকে সেমুড়ো।
এই মুহূর্তে দু’জোড়া চোখ ছোট হয়ে দুলতে দুলতে, বাতাসে ভাসতে ভাসতে পরখ করে দরজার সামনে বৃষ্টির জলে গজিয়ে ওঠা অনেক শ্যাওলাদামগুলোতে। এখন মজেহজে ধূসর হয়ে আছে বিভিন্ন আকারে। অনেকটা দেশ-বিদেশের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ম্যাপের মতো লাগছে। অনেকটা ছেলেবেলায় কেনা ম্যাপ বইটির মতো। এখনও বইয়ের তাকে গোঁজা আছে হয়তো। বাবা কিনে এনেছিলেন।
অদ্ভুত এক গন্ধ নাকে এসে লাগে। পচা গন্ধ নয়। তাহলে এই শ্যাওলাদামগুলো এখনও বেঁচে আছে!
হতেই পারে। আশ্চর্যের কিছুই নয়।
এখন তো বর্ষার সময় নয়, যে অঝোর ধারায় বৃষ্টি হবে। এখন হেমন্তকাল। সাদা পাতলা চাদর গায়ে দিয়ে সেই যে সকালটা মাটিতে নেমে এসেছে, তা এখন দুপুরের গায়ে লাট খাচ্ছে। সেইসঙ্গে অন্ধকার নিজের কালো আলোয়ানটা পাঁচিলের ওপারে রেখে পাঁচিল টপকে উধাও হয়ে গেছে। এটা যে তার পারমানেন্ট প্র্যাকটিস তা স্পষ্ট।
রাজদীপ অফিসের কাজ করতে করতে আরও কিছু অনুসন্ধান করে। অনুসন্ধান তাকে করতেই হবে। আবার দু’জোড়া চোখ ইথার তরঙ্গে ভাসতে ভাসতে, গড়াতে গড়াতে বাড়ির মূল দরজার সামনে এসে থমকে দাঁড়ায়।
কেউ কি এসেছিল? কোনও সময়ে? আসতেও তো পারে! আশ্চর্যের কিছু নয়। তনুকার বন্ধু-টন্ধু? নিশ্চয়ই তার কোনও বয়ফ্রেন্ড আছে? কাজ করতে করতে নিজের মনেই বিড়বিড় করে। ঘন ঘন মাথা নাড়ায়। লম্বা লম্বা শ্বাস ফেলে। তারপর ঢকঢক করে জল খায়। বেল বাজায়।
এখনও অবধি সে স্বীকার করেনি। তবুও রাজদীপের বিশ্বাস হয় না।
মনের মধ্যে একটা খটকা পেন্ডুলামের দ্যোলক হয়ে দুলতে থাকে। ধাক্কা মারে মগজের খুপরিতে। প্রবলভাবে খুঁজতে থাকে জুতোর দাগ। না। কোথাও নেই। একদম ক্লিয়ার।
থাকবে কি করে? তনুকা নিজে হাতে ঝাঁট দেয়। পরিষ্কার থাকতে সে ভালোবাসে। কাজের মেয়েদের প্রতি তার বিশ্বাস নেই। তারা ভীষণ ফাঁকি মারে। তাছাড়া রাজদীপও এখন চায় না। মা-বাবা যত দিন বেঁচেছিলেন ভরসা ছিল। তত দিন কাজের মেয়ে-বউ ছিল।
এখন নেই।
শুনশান বাড়ি। একরকম ফাঁকাই বলা যেতে পারে। তবুও একটা রিস্ক ফ্যাক্টর কাজ করে। সে অফিস চলে যাওয়ার পর তনুকা একা। একদম একা। তার অনুপস্থিতিতে ‘তৃতীয় ব্যক্তি’ কাজ করুক এই বাড়িতে রাজদীপ চায় না। তনুকা বাঁধা দেয়নি। মানিয়েও নিয়েছে।
তনুকা সুন্দরী। পারফেক্ট সুন্দরী যাকে বলে। কোথাও কোনও ছিটেফোঁটা খুঁত নেই। বিয়ের জল ছ’মাস গড়াতেই আরও যেন খোলতাই হয়েছে গায়ের রং। টান টান। অনেকটা ডিমের কুসুমের মতো। ঠোঁটজোড়া যেন কমলালেবুর কোয়া। টসটস করছে। একটু চুমু খেলেই অনেকটা রস মুহুর্তে ছুটে আসবে অপর ঠোঁটে। টিকালো নাক। চোখের তারায় অনেক 'না-বলা কথা' সর্বক্ষণ সাঁতার কাটছে। যে কোনও পুরুষকে ধন্দে ফেলতে তার জুড়ি নেই। মাপা শরীর। তানপুরা পাছা। হাঁটলে পড়ে পাছার মাংসপিণ্ডটা ব্যায়াম করে আনলিমিটেড। সেই ব্যায়াম করা পাছাকে ছুঁয়ে ফেলেছে মাথা ভরতি একরাশ ঘন চুল। বয়স বেশি নয়। মাত্র বছর পঁচিশ। পায়ের আঙুলগুলো অনেকটা কুদুরি ফলের মতো। পুরুষ্টু কাঠালি কলার মতো হাতের আঙুল। সব নিটোল। কোথাও একটুও খুঁত নেই।
রাজদীপ আদর করে। ভীষণভাবে আদর করে। চুমায় চুমায় ভরিয়ে দেয় অকারণে। তনুকা বাঁধা দেয় না। ভালো লাগে। আদর করতে করতে তার মনে হয়, তনুকা যেন সত্যি সত্যি ‘বার্বিডল’।
সেই আবেগে রাজদীপ আকুলভাবে তনুকাকে সাজিয়ে তোলে। সব সময় তনুকাকে সুন্দর দেখতে চায়। হাতের আঙুলে, পায়ের আঙুলে নিত্য নতুন গয়না গড়িয়ে দেয়। প্রতি মাসে একটা না একটা গয়না কিনে নিয়ে আসে রাজদীপ।
তনুকা অবাক হয়ে যায়। বলে-অ্যাতো গয়না কখন পরবো!
-প্রতি মাসে নিত্য নতুন রঙে সাজিয়ে তুলবে নিজেকে। রাজদীপ গম্ভীর গলায় বলে।
-কে দেখবে?
-কেন? আমি... আমি দেখব... আমি...। একমুখ সিগারেটের ধোঁয়া বাতাসে ভাসিয়ে অনেকটা সময় নিয়ে কথাকটি বলে অদ্ভুতভাবে তনুকার দিকে তাকিয়ে থাকে রাজদীপ।
সেইমতো শরীরে একরাশ গয়না পরে সেজে থাকে সর্বক্ষণ। নতুন নতুন শাড়ি আর গয়নায় নিজেকে রাঙিয়ে তোলে। যে কেউ দেখলে অমনি ভাববে, তনুকা বুঝি কোনও বিয়েবাড়ি কিংবা কোনও শপিংমলে বেরুবে।
রাজদীপের ভালো লাগে। তনুকাকে সব সময় এইভাবে দেখতে চায় সে। কিন্তু বাইরের চেহারায় তেমন প্রকাশ পায় না।
এইভাবে সাজুগুজু করে যখন সে স্ত্রীকে নিয়ে বাইরে বেরয় তখন অনেক পাবলিক তাদের দিকে জুলজুল করে তাকিয়ে থাকে। এটা রাজদীপ বুঝতে পারে। তখন তার চোখজোড়া আপনা আপনি গুণিতকে বাড়তে থাকে। বাড়তেই থাকে। মাথার চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে কাচের বলের মতো। ছড়িয়ে পড়তে পড়তে সে দেখতে থাকে অনেক কিছু। বৃদ্ধ থেকে যুবক, এমনকি মেয়ে-বউরাও হাঁ করে দেখছে। দেখছে নয়, শরীরের সমস্ত অনুভূতি যেন এক সঙ্গে ধাওয়া করে চলেছে তনুকাকে। তনুকার শরীরের প্রতি।।
তবে এটা ঠিক রাজদীপকে কেউ দেখছে না। তাকে দেখবেই বা কেন? সে তো বাঁদর। ‘বাঁদরের গলায় মুক্তোর মালা তনু। তনুকা...।‘
বছর দুই আগের কথা। বিয়ের সময় ভিড়ের মধ্যে থেকে ভেসে এসেছিল এই কথাটা। এখনও রাজদীপের মনে গেঁথে আছে। তনুকাও শুনেছিল। তখন তনুকা কি পুলকিত হয়েছিল?
তনুকার মা কেঁদে ফেলেছিল। অজ্ঞান হয়ে গেছিল।
পরে জানতে পেরেছিল বিয়ের আগে তাকে নিয়ে তনুকার বাবা-মায়ের দ্বন্দ্ব লেগেছিল। খুব। তনুকার মায়ের যুক্তি মেয়ের সঙ্গে তার জামাইকে মানাচ্ছে না। একদম না।
এটা বড় সত্য কথা। রাজদীপকে দেখতে একদম ভালো নয়। মুশমুশে কালো। হাইটে ছোট। পাঁচ ফুট দুই ইঞ্চি। মাথাজোড়া বিশাল টাক। বয়সের ডিফারেন্স বছর দশেক।
তাতে কী! তনুকার বাবার যুক্তি জামাই শিক্ষিত। ইঞ্জিনিয়ার। সরকারি উঁচু পদে আসীন। বিরাট টাকা মাহিনা পায়। সে তুলনায় তোমার মেয়ে মাধ্যমিক পাস...।
-তবুও... একবারটি ভেবে দেখ...।
-না। ভাবনার কোনও অবকাশ নেই। তনুকার বাবা বলেছিলেন-আমি হাতে চাঁদ পেয়ে গেছি। মেয়ে আমার সুখে থাকবে। নিরাপত্তায় কোনও ব্যাঘাত ঘটবে না।
-তা ঠিক কথা। ঠিক কথাই বলেছ। তবুও লোকে বলবে জামাই অসুন্দর...।
-বলুক গে...তাতে আমার কিছু যায় আসে না। তারপর তনুকার বাবা খুব রেগে গেছিলেন। পরে বলেছিলেন-তোমার মেয়ে পুতুল নয়, যে শোকেসে রেখে দেবে সারা জীবন। ওকে একাই সব কিছু সামলাতে হবে। সংসার করতে হবে। আমরা তো আর সারা জীবন ওকে আগলে রাখতে পারবো না...।
-হুম। ঠিক কথা।
-এমন পাত্র হাতছাড়া করা মানে...।
এরপর আর কিছু বলেননি তনুকার মা। সব মেনে নিয়েছিলেন। তাছাড়া পাত্র বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। নিজেদের দোতলা বাড়ি। দামী গাড়ি। শিক্ষিত। বড় চাকুরে। হাত ভরতি টাকা। আর কি চাই! আত্মীয়স্বজনে যা বলে বলুক। কিছু যায় আসে না।
বিয়ের বছর দুই যেতে না যেতেই তনুকার শ্বশুর শাশুড়ি পর পর মারা গেলেন। আর তনুকাও বুঝতে পারল দিন দিন পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে রাজদীপের মন। মনের ভিতর। একটা ভয় যেন লাফিয়ে লাফিয়ে তাকে ছুঁতে চাইছে। কারণে অকারণে অনেক প্রশ্ন করে রাজদীপ। যা আগে করত না। সব তাকে ঘিরে।
তনুকা যতটা সম্ভব হাসতে হাসতে তার উত্তর দেয়। আর রাজদীপ ততই গম্ভীর হয়ে যায়। ভাবতে থাকে অনেক কিছু। তারপর আচমকা অনেক কিছু কিনে আনে। যা আগে কিনে আনত না। তনুকা অবাক হয়ে যায়।
তনুকার কোনও কিছুর অভাব রাখেনি সে। যা কিছু চেয়েছে, সবই তার হাতের সামনে এনে হাজির করেছে। কোথাও বেরাতে গেলে এটা সেটা কিনেছে। ঘর ভরতি বিভিন্ন ধরনের শোপিসে সাজিয়ে তুলেছে একের পর এক শোকেস। রাজদীপ চুপিসাড়ে ঘুরতে ঘুরতে এগুলো দেখে। কোথা থেকে কিনেছে মনে করতে পারে না। তখন চিৎকার করে ডাকে তনুকাকে। তনুকা কাজ ফেলে ছুটে আসে। জিগ্যেস করে-বলো, কি বলছ?
-এই শোপিসটা কোথা থেকে কিনেছিলাম, মনে আছে তোমার? উলটে প্রশ্ন করে। তারপর ডান হাতের আঙুল তুলে শোকেসের কাচের ওপর ঝুঁকে পড়ে দেখায় রাজদীপ।
কাচের বাক্সে একটা বার্বিডল সাহেবি কায়দায় ঘুরে ঘুরে নেচে চলছে। অবিরত। ইঞ্চি চারেক লম্বা। সঙ্গে টুং টাং শব্দ হচ্ছে। অনবরত। স্বপ্নের পোশাক পরেছে। কপালে হিরের মুকুট। চুল তনুর মতো অনেকটা। টসটসে ঠোঁটে কমলা রং। হাত পায়ের আঙুলের রঙও ম্যাচিং। তৈলাক্ত হাত পায়ের মসৃণতা দেখতে দেখতে তনুকার কথা মনে পড়ে রাজদীপের। মনে হয়, ওই কাচের বাক্সে বার্বিডলটি সত্যি বুঝি তনুকা!
সে হাতের সিগারেট ফেলে দু’হাত বাড়িয়ে ধরতে চায়। ধরতে পারে না। পালিয়ে পালিয়ে যায়। তনুকা কী সত্যি সত্যি তাকে পছন্দ করে না! তাকে কী ঘৃণা করে!
রাজদীপ ভিতর ভিতর রেগে যায়। ভীষণ রেগে যায়। তারপর জাপটে ধরে তনুকাকে। প্রবল শক্তিতে পিষতে পিষতে রাজদীপ চিৎকার করে ওঠে-বলো, এই শোপিসটা কোথা থেকে কিনেছিলাম?
-আহ ছাড়ো। বড্ড লাগছে। রাজদীপের দুহাতের বাঁধনের মাঝে লড়াই করতে করতে বলে-মানিস্কোয়ার থেকে...।
-তুমি আমাকে ভালোবাসো না?
-বাসি তো...।
-তাহলে তুমি আমার হাত ধরছো না কেন?
-এই তো ধরে আছি। বলতে বলতে তনুকার চোখে জল চলে আসে।
মুখে একটুও হাসির চিহ্ন নেই। একটা আশঙ্কা তাকে ঘিরে ধরেছে প্রবলভাবে। মনে হয়, রাজদীপের গরম নিঃশ্বাস যেন তাকে একটু একটু করে অমানুষিকভাবে পুড়িয়ে দিচ্ছে। সেই আগুনে তার সারা শরীর দাউ দাউ করে জ্বলছে।
বার্বিডলটি তখনও ঘুরে চলেছে। ঘুরতে ঘুরতে হাসছে। হাসতে হাসতে নাচছে। নাচতে নাচতে চুপি চুপি কী যেন বলছে।
তনুকা বুঝতে পারে না। সে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে রাজদীপের দিকে।

0 মন্তব্য
আপনার মন্তব্য জানান